জার্মানির ডায়রি-১৩: একটি চুক্তিপত্র

 

এহা, আমার বড় মেয়ে, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে স্কুলে যাচ্ছে। জার্মানিতে বার বছর থাকার পরও এই দেশের সত্যিকার অনেক কিছুই এখনও জানা হয়নি, সেটা এহা স্কুলে যাবার পর থেকে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করছি।

অনেক বছর এই দেশের মানুষের সাথে মিশে জার্মানদের একটু অন্যরকম মানুষ বলে মনে হয়েছে। তার অনেক বিশেষণের একটা উদাহরণ জার্মানদের নিয়ম মেনে চলার অদ্ভুত ক্ষমতা। ট্রাফিক লাইট লাল হয়ে আছে, রাস্তা ফাঁকা। অথচ তারপরও সবাই লাইট সবুজ হবার জন্য অপেক্ষা করবে। কিংবা রাস্তায় ময়লা ফেলার জন্য অনেক দূর পর্যন্ত ময়লা পকেটে নিয়ে ঘুরবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত ডাস্টবিন খুঁজে পাওয়া যায়। এমন আরও কতও কি!

শোনা যায়, জার্মানির চেয়ে বেশি নিয়ম মেনে চলার দেশ খুব বেশি নাকি নেই। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখানে কোন না কোন নিয়ম আছে, এবং এই নিয়মগুলো এই দেশের মানুষরা পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মেনে চলে। এক এক সময় মনে হয়, এরা রোবট নাকি!

প্রোডাক্ট দেখে কারখানার প্রোডাকশনের সব নিয়ম নীতি আর প্রসেস বোঝা যায় না। এই দেশের স্কুল হল মানুষ গড়ার কারখানা, আর সেই কারখানার প্রোডাক্ট হল জার্মানরা। এতদিন জার্মানদের দেখে এই দেশের প্রোডাক্ট গুলোর সাথে পরিচিত হয়েছি। এইবার এহার স্কুল শুরু হবার পর থেকে স্কুলে কিভাবে নিয়ম কানুন শিখিয়ে এই প্রোডাক্ট তৈরি হচ্ছে, সেটা একটু একটু করে শিখছি।

সেদিন এহা স্কুল থেকে এই চুক্তিপত্রটা নিয়ে এসেছে, পড়ে আমি রীতিমত হতবাক। খুব সামান্য একটা ব্যাপার, সেটা নিয়ে আবার বাবা-মার সাক্ষর থেকে শুরু করে এহাকেও সিগনেচার দিতে হবে, একেবারে লিগ্যাল একটা চুক্তিপত্রের মতন। শুধু এহাকে নয়, ওদের ক্লাসের প্রতিটি বাচ্চাকেই এই চুক্তিপত্র দেওয়া হয়েছে।চুক্তিপত্র

স্কুলে কোন বাচ্চা যদি ক্লাস চলাকালীন সময়ে পাশের বন্ধুর সাথে কথা বলে, অথবা টিফিন পিরিয়ডে যদি অন্য কাউকে বিরক্ত করে, কিংবা কোন কারণ ছাড়াই একটা বাচ্চা ঘ্যান ঘ্যান করে কাঁদছে – এই রকম যেকোন পরিস্থিতিতে হাতের পাঁচ আঙ্গুল মেলে ধরে (ছবির মতন) যখনই সেই বাচ্চাকে বলা হবে, “স্টপ!”, তাহলে সাথে সাথে তাকে সেটা থেকে বিরত হতে হবে। প্রতিটি বাচ্চার সাক্ষর নিয়ে এই চুক্তিপত্রগুলি তাদের ক্লাসরুমের একটা দেয়ালে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কেউ যদি কথা না শোনে, তাকে দেয়ালে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হবে, সে কিন্তু চুক্তিবদ্ধ! একই সাথে বাবা-মার সিগনেচারের মানে হচ্ছে বাবা -মাও সন্তানকে সুন্দর ব্যবহার এবং স্কুলের নিয়মকানুন মেনে চলার জন্য দায়বদ্ধ থাকবেন।

এই দেশে বাচ্চাদের গায়ে হাত তোলা দণ্ডনীয় অপরাধ, স্কুলে বা বাসায় বাচ্চাদেরকে সামান্য ধমক দেওয়ার বেশি কেউ ভাবতেও পারে না। তারপরও স্কুলের ক্লাসগুলো চমৎকার শৃঙ্খলা বদ্ধ ভাবে চলে। এই বাচ্চাদেরকে ছোটবেলা থেকেই মাথার ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, কিভাবে অন্যের মতামতকে সম্মান জানিয়ে পথ চলতে হবে। তাই বড় হয়েও অসংখ্য নিয়মের দেশে এদের চলতে কোন অসুবিধে হয় না।

আদনান সাদেক, ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা

Print Friendly