জার্মানির ডায়রিঃ১১ দ্বিতীয় জন্ম

 

সময়কাল, ২০১১।

রবিবারের বন্ধের দিনে ফাঁকা রাস্তার ফুরফুরে বাতাসে গাড়ীর স্পীড উঠে যাচ্ছিল নিজ থেকেই। গন্তব্য হাইডেলবার্গ। ক্রিকেট বোর্ডের একটা মিটিং, এর জন্য দুই ঘণ্টা ড্রাইভ করা। লিগের খেলা নিয়ে বেশ কিছু ঝামেলা চলছে, এখানের বেশিরভাগ ক্রিকেট খেলে পাকিস্তানের ছেলেপেলেরা। এই প্রজাতির মানুষেরা কোথাও একজোট হলে ঝুঁট ঝামেলা ছাড়া কিছু করতে পারে না। স্টেট বোর্ডে ছয়জনের মধ্যে চারজনই পাকিস্তানী, এদের আবার নিজেদের মধ্যে দুই পক্ষ। দুই পক্ষই চেষ্টা করছে আমাকে তাদের দলে ভেড়াতে, কোরামের ভোট জেতা যাবে তাহলে। ইচ্ছে হয় মুখের উপর বলি, তোমাদের কারোর সাথেই আমি নাই! আপাতত অন্য অপেক্ষাকৃত ভদ্র দলগুলোর কথা ভেবে বোর্ডে একটা ভালো ডিসিশনে আসতে হবে। পছন্দ না হলেও ক্রিকেটের স্বার্থে ভদ্রতা করে মুখে হাসি নিয়ে এদের বয়ান শুনতে হবে একটু পরেই।

কার্লসরুহ পার হবার পর বাসেল (জার্মান সীমান্তে সুইজারল্যান্ডের একটা শহর) আর ফ্রাঙ্কফুর্টের অটোবানে প্রায়ই জাম লেগে থাকে, আজকে রবিবার হলেও রক্ষা পেলাম না। কার্লসরুহের মোড় পার হয়েই দেখি বিশাল জাম। ন্যাভিগেশনে দেখলাম কম করে হলেও ৪৫ মিনিট দেরি হবে এখানে। অবশ্য একটা অলটারনেটিভ পথও সে বাতলে দিল। হাইওয়ে ছেড়ে লান্ডস্ট্রাসে (বিভাগীয় সড়ক বলা যেতে পারে, যেখানে রাস্তার মাঝখানে কোন স্থায়ী ডিভাইডার নেই, এবং দুইদিকেই শুধু একটা করে লেন) নিতে হবে। এতে করে ১৫ মিনিট বেচে যাবে।

মিটিঙে দেরি হয়ে যাবে – একইসাথে একটু এডভেঞ্চার। ন্যাভিগেশন তো সাথেই আছে, ঢুকে গেলাম অচেনা রাস্তায়। এই রাস্তাগুলোও বোধহয় আমাদের দেশের হাইওয়ে থেকে একটু চওড়া হয়, ১০০ কিমি পর্যন্ত স্পীড তোলা যায় কোনরকম বুককাঁপুনি ছাড়াই। অবশ্য অনুভবে মনে হল, বেশিরভাগ গাড়িই ঘন্টায় ১২০ থেকে ১৪০ কিলোমিটার গতিতে চলছে। দুই দিক থেকে গাড়ী চললেও মাঝখানে দাগ কেটে ভাগ করে দেওয়া আছে, পাশ কেটে যাবার সময় বাতাসের একটা আচমকা ধাক্কা লাগে, এই পর্যন্তই।

কালকে বাংলাদেশীদের একটা অনুষ্ঠান আছে স্টুটগার্টে। বড় মেয়েটা আসার সময় বলছিল কাল কি রঙের জামা পড়বে, ওর প্রিয় রঙ গোলাপি। অবশ্য এই বয়সের মেয়েগুলির প্রায় সবারই বোধহয় এই রঙ প্রিয়। রাতে ফিরে গিয়ে আমাকে সেই জামা পড়ে দেখাবে, ঘুমিয়ে পড়ার আগেই যেন ফিরে আসি সেই প্রতিজ্ঞা করিয়েছে বার বার করে রওয়ানা দেবার আগে। ছোট মেয়েটা এখনও রঙ টঙ বোঝে না, তার সব বায়না এখনও শুধু বড় বোনের অনুকরণে করা। মেয়েগুলির কথা সবসময় মাথায় ঘুরে, ঘর থেকে একটু দূরে গেলেই এমনটা হয়।

শোঁ শোঁ করে পাশ দিয়ে গাড়ি গুলো চলে যাচ্ছিল। আশপাশ যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই সবুজের ছড়াছড়ি। মৃদু বাতাসে হালকা কাঁপন গাছের পাতায় পাতায়, খুব একটা শান্তি শান্তি ভাব চারদিকে। দূরে পাহারের দিকে তাকালে মনটা উদাস হয়ে যায়, সেখানে পাহাড়ের কোলে টুকটুকে লাল লাল ছাদের সারি সারি বাড়ি। ড্রাইভ ওয়ে থেকে দেখতে না পেলেও মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা রাইন নদীর অপার সৌন্দর্য টের পাওয়া যায়। অনেকদিনের স্বপ্ন এই রকম পাহাড়ের উপর একটা বাড়ি হবে, যার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখা যাবে বহমান একটা নদী। সূর্যাস্তের সময় নদীর পাশের ছাউগাছের ছায়াগুলো লম্বা হতে হতে একসময় আমাদের ছুঁয়ে দেবে। আমরা, আমি আর সেই মায়াবতী। বিদায় নিয়ে আসার সময় হাতটা একবার ছুঁয়ে দিয়েছিল, এখনও সেখানে একটা উষ্ণ কোমল অনুভূতি ছুঁয়ে আছে।

ড্রাইভ করতে করতে সেদিন খুব নস্টালজিক হয়ে যাচ্ছিলাম, হয়তো সেটা আশে পাশের অসহ্য সুন্দর প্রকৃতির কারণেই কিনা। দেশ ছেড়েছিলাম সেই কত বছর আগে, ভাগ্যের সন্ধানে। মায়াবতীকে পেছনে ফেলে নতুন দেশে নতুন জীবনের খোঁজে। কেমন করে ৯টা বছর পার হয়ে গেল, কত উথাল পাথাল ঢেউ এলো আর গেল। এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছি, পাহাড়ে ঢালে বাড়ি কেনার স্বপ্নও পর্যন্ত দেখতে পারি। স্ত্রী কন্যা নিয়ে প্রিয়তম মানুষগুলোর সাথে বেশ কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। এটাই তো মনে হয় সেই অনেক কাম্য জীবন, যার স্বপ্ন দেখেছিলাম জীবনের প্রথম পঁচিশ বছরে! প্রবাসে শুরু হয়েছে বুঝি দ্বিতীয় জনম।

মাঝে মাঝে একটা শূন্যতা আসে দেশের কথা মনে করে। সেখান থেকে আসা খবরগুলো এখনও হতাশা ব্যঞ্জক, মানুষের জীবন এখনও অনেক সস্তা। সেখানে স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নেই, দেশে ফেলে আসা বাবা মা থেকে শুরু করে আর সবাই যেন কেমন বেঁচে মরে থাকে। এই যে মসৃণ রাস্তায় দ্রুত গতির মার্সিডিজে যেতে যেতে আশপাশের সবুজের ছোঁয়ায় রোমাঞ্চিত হচ্ছি, সেখানে গতকালও পত্রিকায় দেখেছি দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ অনেকগুলো মৃত্যুর খবর। সময়ের সাথে সাথে এই দেশের নিরাপদ জীবনে যতই অভ্যস্ত হতে থাকি, ততই যেন সামনে সবসময় ভাসে ফেলে আসা নিজের দেশের সাথে বিকট পার্থক্যগুলি। আমরা ভালই আছি, তবু দূরে ফেলে আসা প্রিয়জনরা ভাল নেই – এই অনুভূতিটুকু নিজের অজান্তে ভেতরে একটা কেমন যেন শূন্যস্থান তৈরি করে রাখে। মাঝে মাঝেই চিন্তাগুলো সেখানে পা ফসকে পড়ে যায়, তখন আর কেন যেন কিছুই ভাল লাগে না। একটা অপরাধ বোধ চেপে আসে চারদিক থেকে- নিজের আখের গোছানো হয়ে গেল, দেশের জন্য আর ফেলে আসা মানুষগুলোর জন্য করা হল না কিছুই।

রাস্তাটা সামনে বেশ খাড়া একটা মোড় নিয়েছে বাঁ দিকে। বাঁয়ে মোড় নিতে নিতে সেন্ট্রিফুইগ্যাল ফোর্সের সাথে সাথে মনে হতে থাকে রাস্তা থেকে বের হয়ে পড়ে যাচ্ছি পাশের খাঁদে। অনেকদিন গাড়ি চালালেও এখনও কেমন যেন একটা অস্বস্তি বোধ হয়, বিশেষ করে স্পীড বেশি থাকলে। মোড় নেবার সময় অপর পাশ থেকে আসা দ্রুতগতির একটা বিশাল পোর্শের জিপ দেখে গতি কমাতে ব্রেকে পা দিলাম। বাঁ দিকে বাঁকের কারণে (জার্মানিতে ড্রাইভাররা বাঁ দিকে বসে, বাংলাদেশের ঠিক উল্টো) মনে হতে থাকে যেন উল্টো দিকের জিপটা ঠিক আমার দিকেই ছুটে আসছে ভয়ঙ্কর গতিতে।

বাঁকটা প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা হবে, এই দূরত্ব অবশ্য দুইদিক থেকে শত কিলোমিটার গতিতে ছুটে আসা গাড়িগুলোর কাছে কিছুই নয়। একটু অন্যমনস্ক থাকলেও নিজের লেনে ঠিক ঠিক ছিলাম। অপর পাশের গাড়িটা মনে হল যেন বাঁকে ঠিক মতো স্টিয়ারিং করছে না। আমার থেকে বড়জোর ৫০ মিটার দূরে, সেই সময় দেখলাম জিপটার একটা চাকা মাঝখানের দাগ পার হয়ে আমার লেনে চলে এসেছে। ড্রাইভারটা কি বেখেয়ালে নাকি! ব্রেকের উপর ডান পাটা নিজ থেকেই চেপে বসল।

জীবনের সত্যিকারের ভয়াবহ মুহূর্তগুলোর আসলে কোন বর্ণনা হয় না, বিশেষ করে মানুষ যখন মৃত্যুর খুব কাছে চলে আসে। এখনও যদি চোখ বুজি, স্পষ্ট দেখতে পাই বিকট একটা কালো দানব বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে আসছে আমার দিকে। ড্রাইভারটা কি ঘুমিয়ে পড়েছিল খুব অল্প সময়ের জন্য? কিংবা হয়তো সেই মুহূর্তে ফোন বেজে উঠেছিল? ফুলব্রেক করার মতন সময় ছিল না। আর করলেও কি। অন্য দিকের গাড়িটা কমপক্ষে ১২০ কিমি গতিতে ধেয়ে আসছিল। একদম শেষ মুহূর্তে দেখলাম গাড়িটা আমার লেনের প্রায় অর্ধেকে চলে এসেছে। পাশে একটা খাদ মতন। তখন কি ভাবছিলাম এখন আর ঠিক মনে করতে পারি না। সামনের গাড়ির সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ নাকি স্টিয়ারিং করে পাশের খাঁদে নেমে যাওয়া – কোনটা ভাল অপশন এই বুদ্ধি খেলেনি মাথায় -এটা নিশ্চিত বলা যায়। শুধু টের পাচ্ছিলাম বুকের ভেতরটা হঠাত করে ফাঁকা হয়ে গেল। হৃৎপিণ্ড থেকে ছলকে ছলকে সমস্ত শরীরে যেন রক্তপাত হতে লাগল। নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না কিছুতেই। মনে হল এটাই তাহলে শেষ!

অপর পাশের চালক যখন স্টিয়ারিং কন্ট্রোলে আনার চেষ্টা করছে বলে অনুমান করা হয়, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মৃত্যুভয়ে কাঁপতে কাঁপতে আমি ডানে বামে কোনদিকেই গাড়ি ঘোরাতে পারলাম না। সেটাই অবশ্য শেষমেশ মন্দের ভাল হয়ে দাঁড়ালো। আমার বাঁ কাঁধের উপর নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে জিপটা আমার গাড়ির বডিতে তীব্র শব্দে একটা আঁচড় কেটে পার হয়ে গেল। আমার খুব কাছেই পেছনে ছিল পর পর আরেকটা দুটো গাড়ি।

হলিউড ছবিতে কত দেখেছি এমন মুখোমুখি সংঘর্ষ। তারপর গাড়িগুলো টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে উড়ে পড়তে থাকে স্লো মোশনে। মাথার উপরের আয়নায় যেন সেই সিনেমার দৃশ্য দেখলাম। জিপটা আমাকে পার হয়েই পুরোপুরি আমার লেনে চলে গেল, পেছনে আসা গাড়িগুলির প্রাণপণ ব্রেক করার চেষ্টা বৃথা করে দিয়ে তাদেরকে নিয়ে অনেকটা যেন বাতাসে উড়াল দিল পোর্শেরুপী দানব।

আমি গাড়ি থামিয়ে কোনমতে বের হয়ে রাস্তার উপরই বসে পড়লাম। দূর থেকে দুর্ঘটনা টের পেয়ে সব দিকের গাড়িরা থেমে গেছে। অন্য দিক থেকে ছুটে এসে দুই জন আমাকে মনে হল তুলে ধরল। জানতে চাইল, ঠিক আছি কিনা! একটু পরে চারদিক আলোকিত করে হেলিকপ্টার আসল। জিপের ড্রাইভারকে অবশ্য বাঁচানো গেল না। অপর পাশের গাড়ির আরেকজন মারা গেল পরের দিন হাসপাতালে।porsche_cayenne_unfall

প্রথম জন্মমুহূর্তের স্মৃতি আমাদের কাররই মনে থাকেনা। কেউ কেউ নাকি ড্রাগ নিয়ে চেষ্টা করে মায়ের গর্ভ থেকে বের হবার সময়ের অনুভূতির স্বাদ নেবার। তবে কেউ কেউ আবার বেঁচে থাকতে থাকতেই আরেকবার জীবন পায়, তাদের দ্বিতীয় জন্ম হয়। সেই দ্বিতীয় জন্মের প্রতিটা মুহূর্ত আমি টের পেলাম। সেই জন্মে কি অসম্ভব বেদনা, বেঁচে থাকার কি অলীক আনন্দ! চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকলো এক একটা করে প্রিয়জনের মুখগুলো। এদেরকে হারাতে যাচ্ছিলাম আর এই একটু হলেই! কয়েক মিনিট আগেও ভাবছিলাম কত সুখে আছি, আর বেমালুম ভুলে ছিলাম মরণ যে আমাদের কত কাছেই না থাকে।

গোধূলির শেষ আলোতে দুইপাশে অসংখ্য সন্ত্রস্ত মানুষের মাঝে আরেকবার পৃথিবীতে নতুন করে জীবন শুরু করার উপলব্ধিতে আমার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি গড়াতে থাকল। নতুন জীবনের শুরুটা বোধকরি সবসময় কান্না দিয়ে শুরু হয়। বেঁচে থাকার চেয়ে বড় উপহার জগতে আমাদের আর কিছুই নেই।

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা

আদনান সাদেক, ডিসেম্বর ২০১৩

Print Friendly, PDF & Email