• Home »
  • BSAAG »
  • জার্মানির ডায়রিঃ১০ ক্রিকেট এবং একটি স্বপ্নপূরণ

জার্মানির ডায়রিঃ১০ ক্রিকেট এবং একটি স্বপ্নপূরণ

 

জার্মানিতে সবচেয়ে কঠিন কাজ কি – এই প্রশ্ন যদি কেউ করে, নির্দ্বিধায় উত্তর দিতে পারি। এটা জব পাওয়া নয়, নিজের একটা কোম্পানি দাঁড় করানো নয়, ইলেকশনে জেতা নয়, পরীক্ষা পাস করা নয়। এমনকি জার্মান ল্যাংগুয়েজ শেখাও নয়। এটা হল বাংলাদেশীদের ক্রিকেট খেলার জন্য এক জায়গায় জড়ো করা (এবং যেখানে বিনামূল্যে খাওয়া সরবরাহ করা হবে না)।

২০০৬ সালের কথা। ডর্টমুন্ডে থাকি, সম্প্রতি ড্রাইভিং পাশ করেছি। জব টব পেয়ে একটু যখন সুস্থির হলাম, তখনই খেয়াল করলাম আমাদের আশে পাশের বাংলাদেশীদের উইক-এন্ডগুলিতে মূলত পার্টি আর খাওয়া দাওয়া ছাড়া আর কিছুই হয়না। ও আর একটা আছে, সেটা হল খাওয়া দাওয়ার সময় সবাই গোল হয়ে বসে যে যে পার্টিতে নেই তাদের লিস্ট ধরে ধরে গীবত গাওয়া। কার কি দোষ, কে কাকে কোন দাওয়াত দেয়নি, কীভাবে কে দুই নম্বরি করে কোথায় জব পেয়েছে – এমন কত কি। কালে ভদ্রে দুই একটা ভাল কথাও যে আসে না তা নয়। তবে সব মিলে শুধু খাওয়া আর চাপাবাজি পিটিয়ে উইকেন্ডগুলো কেটে যেতে লাগল। খেলাধুলার প্রতি আমার অসম্ভব আগ্রহ, কিন্তু হঠাত করে আবিষ্কার করলাম সেই ব্যাপারে অন্যদের প্রায় কোনই আগ্রহ নাই। কালে ভদ্রে কাউকে নিয়ে যদি ভরাট গরমের দিনে ক্রিকেট ব্যাট হাতে বাইরে নিতে পেরেছি, খেলার সময় হলেই দেখা যেত সবাই খেলার চেয়ে ছবি তোলার দিকে বেশী আগ্রহী। ডর্টমুন্ডে একটা সামার চলে গেল, ক্রিকেট খেলতে পারিনি। সকাল বিকাল চাকরি করি, মাস শেষে বেতন পাই, বাসায় সন্ধ্যায় সুন্দরী বউ মজার খাবার রান্না করে, উইক-এন্ডে এখানে ওখানে পার্টি লেগেই আছে, কয়েকদিন আগেই মেয়ের বাপ হয়েছি – অনেক ব্যস্ততা। তারপরও আমি বাথরুমে আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে একা একা দীর্ঘশ্বাস ফেলি। এই জীবন লইয়া আমি কি করিব, যেখানে এত সুন্দর রোদের মধ্যে এত সুন্দর ঘাস বিছানো মাঠে ক্রিকেট খেলা হয়না!

একবার খবর পেলাম কাসেলে ক্রিকেট খেলা হয়, টিটু ভাই সেখানে আয়োজক, তার সাথে আরও অনেক ছেলে পেলে আছে, এবং তাঁরা প্রায়ই ক্রিকেট খেলে। তাদের নাকি কবে একটা পার্টি আছে, এবং সেখানে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হবে। সম্প্রতি ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছি, এখনও একা গাড়ী চালাতে হাত কাঁপে। কাসেল প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে। নিজের গাড়ী নেই, একটা মার্সিডিজ গাড়ী ভাড়া করলাম। আমার স্ত্রী কিছুতেই দুই মাসের ছোট বাচ্চাকে নিয়ে এতদূরে গাড়ী নিয়ে যেতে আগ্রহী নয়, আবার আমাকে একা ছাড়তেও রাজি না। মাত্র দেড়শ কিলোমিটার দূরে ক্রিকেট খেলা হচ্ছে আর আমি ডর্টমুন্ডে বসে মুরগীর ঠ্যাঙ চাবাবো – একটা উপায় বের করতেই হবে। কাসেলের পার্টিতে অনেকের বউরা আসবে, অনেক মজার মজার রান্না হবে ইত্যাদি বুঝ দিয়ে দুই মাসের নবজাতিকাকে পেছনে বসিয়ে বউয়ের কাল মুখ দেখতে দেখতে কাসেল চলে গেলাম।Team BSAAG

ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নামেমাত্র, কাসেল গিয়ে দেখি বিশাল খাবারের আয়োজন। আমরা শুধু দূর থেকে এসেছি এমন নয়। অনেকেই এসেছে ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে, এমনকি আরও দুই একটা শহর থেকে। কেউ খেলা নিয়ে কোন কথাই বলছে না। এতদিন পর দেখা, খোশ গল্প করেই দিন পার হয়ে যায় বলে। টিটু ভাই আমার মুখ শুকনো দেখে বললেন, কি আদনান, ঠিকমত খেয়েছ তো?

আমি ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলাম, টিটু ভাই, খেলা হবে তো শেষ পর্যন্ত?

টিটু ভাই সিরিয়াস ভঙ্গীতে বললেন, হবে না মানে, একশবার হবে। সেটাই তো আমাদের আসল উদ্দেশ্য!

Jamal stopped a 6

বিকাল ৩টায় সবাই নিজের ওজনের চেয়েও বেশী গলদ্ঘরন করে টলতে টলতে পাশের একটা মাঠে গেল, খেলার কথা বলে। আমাকে বেশিরভাগই চেনে না, আবার প্রায় সবাই আমার থেকে বয়েসে বড়। ব্যাটিং পেলাম প্রায় সবার শেষে। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দলের অবস্থা বেশ খারাপ। টিটু ভাইয়ের দুর্দান্ত বোলিং এর মুখে মাত্র ২০ রানের মাথায় আমাদের প্রথম সারির ব্যাটসম্যানরা প্যাভিলিয়নে ফিরে এসেছেন। অবশ্য তাদের বেশীরভাগকেই তার জন্য একটুও দুঃখিত মনে হল না। বরং ভরা পেটে একটু জিরিয়ে নেওয়া যাবে, এর জন্যই তাদের বেশী খুশী মনে হল। অনেক বছর পরে ব্যাট হাতে পেয়েছি, তাও আবার টুর্নামেন্ট (!) বলে কথা। শুধু ক্রিকেট খেলতে পারছি – এই আনন্দে চোখ বুজে হাঁকাতে থাকলাম। লং-এর বাউন্ডারি বেশী দূরে নয়, আমার ফেভারিট শট হল স্ট্রেট ড্রাইভ। কিছুক্ষণের মধ্যেই লং- বাউন্ডারিতে বল খোঁজা শুরু হয়ে গেল। পনের ওভারে দলের রান একশ ত্রিশে নিয়ে ব্যাট থেকে নামলাম। খেলার ফলাফল নিয়ে আর বেশী কিছু বলার নেই, আমরা অনেক রানের ব্যবধানে জিতলাম। টিটু ভাই খুব করে রিকোয়েস্ট করছিলেন রাতেও খেয়ে যেতে, এরমধ্যে বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি তখন অনেক বছর পরে ক্রিকেট খেলে, “তুমি এলে, অনেকদিনের পরে যেন বৃষ্টি এল” –মনে এমন একটা পরিপূর্ণতা নিয়ে ফুরফুরে মেজাজে আছি। কালকে অফিস আছে, ভাড়া করা গাড়ী ফেরত দিতে হবে – এইসব বলে আপাতত রাতের খাবার (এবং গীবত-আড্ডা) পাশ কাটালাম।

ফিরে আসার সময় একটা ঝামেলা হয়ে গেল। চারদিক কালো করেTeam B বৃষ্টি শুরু হয়েছিল একটু আগেই, দেখতে দেখতে ভীষণ ঝড় শুরু হল। অনেক বৃষ্টি হলে যেটা হয় আরকি, গাড়ীর উইন্ড-শিল্ড ঝাপসা হয়ে আসে। নতুন নতুন গাড়ী চালাই, তখনও এই ব্যাপারটা জানি না। সামনে হাত বাড়িয়ে গ্লাস পরিষ্কার করতে করতে গাড়ী চালিয়ে যাচ্ছি। একটা সময় খেয়াল করলাম, কোনভাবেই এত বেশী কুয়াশা মতন জমে যাচ্ছে যে সামনে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। কি করব, আমার স্ত্রীকে বললাম পাশে বসে উইন্ড-শিল্ড পরিষ্কার করতে, সামনের দুই একটা নব যা পেলাম টিপে লাভ হল না। আমরা তখন অটোবানে (হাইওয়ে), গাড়ী থামানোর উপায় নেই। আশে পাশে শোঁ শোঁ করে অন্য গাড়ীগুলো পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। সামনে বড়জোর দশ মিটার দেখতে পাচ্ছি। আমার স্ত্রী ক্ষেপে গেল কিছুটা। এমন অবস্থায় বাচ্চাটাকে নিয়ে কেউ এতদূর গাড়ী চালায়। আমিও একটু দমে গেছি তখন, এই না একটা এক্সিডেন্ট না হয়ে যায়। পেছনে ছোট একটা জীবন, বেশী রিস্ক নিয়ে ফেলেছি। খুব আস্তে আস্তে গাড়ী চালিয়ে দেড় ঘণ্টার ড্রাইভ তিন ঘণ্টায় সামাল দিয়ে বাসায় পোঁছালাম অনেক রাতে। আপাতত অনেকদিন ক্রিকেটের কথা মুখেও আনব না – এমন প্রতিজ্ঞা নিয়ে বাসায় ঢুকলাম। এরপর সত্যি সত্যি অনেকদিন খেলা বন্ধ থাকল। (গাড়ীর ব্যাপারটা বুঝতে অনেকদিন সময় লাগল। সামনের উইন্ড-শিল্ড ঝাপসা হয়ে গেলে সামনে একটা হিটার চালিয়ে দিলেই মুহূর্তে পরিষ্কার হয়ে যায়, এই সামান্য জ্ঞানটার অভাবে সেদিন আরেকটু হলে বড় ধরণের একটা ঝামেলা হয়ে যাচ্ছিল প্রায়।)Run out

ক্রিকেট অবশ্য থেমে থাকল না। স্টুটগার্ট চলে আসি ২০০৮ এর দিকে, এখানে এসে আবার পুরোদমে নিয়মিত ক্রিকেট খেলছি গত ৪-৫ বছর ধরে। গল্পটা শুরু করেছি যেই কঠিন কাজের কথা বলে, সেটা এখানে আরও হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি গত অনেক বছর ধরে। রবিবারে সপ্তাহের একদিন মাত্র খেলা, তার জন্য বেশিরভাগ ছেলে পেলেকে হাতে পায়ে ধরতে বাকি থাকে। রাতে ঘুম হয় নাই, একটু কাজ আছে, ভাইয়া-পায়ে ব্যাথা, বাংলাদেশে বাসায় ফোন করতে হবে, অমুক ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত আছে- না গেলে মাইন্ড করবে – অজুহাত শুনতে শুনতে একসময় বিরক্ত হয়ে বাংলাদেশীদের ছেড়ে ইন্ডিয়ান পাকিস্তানীদের সাথে খেলা শুরু করলাম।

শুধু খেলা নয়, একইসাথে চলল ক্রিকেট ডেভেলপমেন্টের কাজ। সাথে খুব বেশী বাংলাদেশীদের না পেলেও স্টুটগার্টে প্রথম একটা রেজিস্টার্ড ক্লাব করে ফেললাম। বুন্দেসলিগায় খেলা থেকে শুরু করে স্টুটগার্টে আমরাই প্রথম ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্টের আয়োজন করতে থাকলাম। সেই টুর্নামেন্টগুলির সবচেয়ে বড় শিক্ষা: জার্মানিতে সবচেয়ে কঠিন কাজ হল বাংলাদেশীদের ক্রিকেট খেলার জন্য এক জায়গায় জড়ো করা (এবং যেখানে বিনামূল্যে খাওয়া সরবরাহ করা হবে না)। আস্তে আস্তে আমাদের ক্লাবে বাংলাদেশীদের সংখ্যা কমে আসছে, বাড়ছে ইন্ডিয়ান পাকিস্তানীসহ অন্যান্য দেশের খেলোয়াড়। জার্মানির সবচেয়ে বড় ক্রিকেট ক্লাব হিসেবে জন্ম থেকে পরপর চারবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছি, জার্মান ক্রিকেট বোর্ডের এক্সিকিউটিভ হয়েছি এরিমধ্যে, শোনা যায় ইউরোপের ক্রিকেট ইতিহাসে নাকি প্রথম কোন বাংলাদেশীর জন্য এমন একটা অবস্থানে আসা। তারপরও যখন মনে হয়, আমাদের ক্লাবে খুব সীমিত সংখ্যক বাংলাদেশীদের অংশগ্রহণ, জার্মানিতে ক্রিকেট বলতে এখনও শুধু ভারতীয় বা পাকিস্তানীদের আধিপত্য, তখন মনটা খারাপ হয়ে যায়। অথচ আমাদের জাতীয় খেলা এখন ক্রিকেট!

বিসাগের একটি দল বাংলাদেশের পতাকা গায়ে নিয়ে মাঠে নামবে জার্মানির মাটিতে, সেই দলে আমিও খেলব – এমন একটা স্বপ্ন অনেকদিনের। সামনের শনিবার, ২৯শে জুন সেই স্বপ্ন সফল হতে যাচ্ছে। চারদিক থেকে ছুটে আসছে অনেকগুলো ক্রিকেট পাগল ছেলেপেলে। মানহাইম, ডার্মস্টাড, ফ্রাঙ্কফুর্ট, ইয়েনা, নুরনবার্গ, আলেন, স্টুটগার্ট, মিউনিখ থেকে ছুটে আসছে তৌফিক, তৌসিফ, মাজহার, তালেব, মাইনুল, জামাল, রনি, টিটু ভাই, মামুন, নাইম, নিয়াজ এমন অনেকগুলো মুখ। উপলক্ষ জার্মান কর্পোরেট লিগ। আট দলের লিগের শুধুমাত্র একটি দলে থাকছে লাল সবুজের পতাকাধারী কয়েকজন যুবক। প্রতিপক্ষে থাকছে ভারত, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড থেকে আগত প্রবাসীদের নিয়ে গড়া শক্ত কয়েকটি দল।BSAAG Cricket Team

কে যেন বলল, স্টুটগার্টে নাকি ঐদিন অনেকে পিকনিক করতে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে আমাদের বিসাগের অনেক ভলান্টিয়ারও আছে। ভাল ভাল খাবার ফেলে অনেকেই আসতে পারবে না। মনে মনে হাসি, আমাদের খাদ্য বিলাসের ইতিহাস শেষ হতে এখনো অনেক বছর বাকি। ক্রিকেটের লিগের খেলা দেখতে না আসতে বলে শুধু খাবার আমন্ত্রণ দিলে মাঠে জায়গা থাকতো না। আমাদের আপাতত জার্মানিতে হাজার হাজার বিসাগ সদস্যের সমর্থন নিয়েও দর্শক বিহীন খালি মাঠে খেলতে নামতে হবে। আমাদের ছেলেপেলেদের খেলার মাঠে আনা – এটা অনেক বছরেও কঠিনতম কাজ হিসেবে থেকে যাচ্ছে।
আদনান সাদেক, ২০১৩

২৬শে জুন, ২০১৩

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা

Print Friendly
Adnan Sadeque
Follow me

Adnan Sadeque

লেখকের কথাঃ
http://bsaagweb.de/germany-diary-adnan-sadeque

লেখক পরিচয়ঃ
http://bsaagweb.de/adnan-sadeque
Adnan Sadeque
Follow me