জার্মানির ডায়রি ১: অপমান

 

অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও ক্লাসে একদম মন দিতে পারছি না। প্রফেসর ফিঙ্গার যে খুব জটিল কিছু পড়াচ্ছেন, তা নয়। ব্ল্যাকবোর্ডে আঁকা গ্রাফ আর সমীকরণ দেখে মোটামুটি ধারণা করছি আজকের বিষয়বস্তু। প্রফেসর ফিঙ্গার থিওরেটিক ফিজিক্সের একটা সাধারণ থিউরি পড়াচ্ছেন, বিষয়টা কোনো একসময় বুয়েটে থাকতে গলাধঃকরণ করেছিলাম, অতটুকু বুঝতে পারছিলাম সেটার জন্যই।

সমস্যাটা যে শুধু আজকের ক্লাসটা নিয়েই তা নয়, সেমিস্টারের শুরু থেকেই একটা কিছু গোলমাল হয়েছে, কোনো ক্লাসেই ইদানীং আর কিছু বুঝতে পারছি না মন বসবে কী করে। চায়নিজ, ইন্দোনেশিয়ান, ব্রাজিল, মেক্সিকান, জর্ডান, ইন্ডিয়ান অন্য সব দেশের ছেলেমেয়েরা দেখি ধুমধাম করে নোট টুকে যাচ্ছে। ফ্রাও মেইসিঙ্গেনের ই-মেইলের কথা মনে পড়ে গেল। ভর্তির অনুমোদনপত্র পাঠানোর সময়ই সতর্ক করে লিখেছিলেন, এই মাস্টার্স প্রোগ্রামে দ্বিতীয় সেমিস্টার থেকে সব কোর্স জার্মান ভাষায় পড়ানো হবে। সবেমাত্র তখন ধানমন্ডির গোয়েথে ইনস্টিটিউট থেকে লেভেল ওয়ান শেষ করেছি, দ্বিতীয় সেমিস্টার শুরু হতে অনেক বাকি, এর মাঝে নিশ্চয়ই জার্মান ভাষা ভেজে খেয়ে ফেলব। গুগলে একটা অনুবাদ করে ফ্রাও মেইসিঙ্গেনকে জানিয়ে দিলাম আসছি… তাও আবার জার্মান ভাষায়।

এপ্রিল মাসে জার্মানিতে পা রাখার পরপরই আমার জার্মান ভাষাজ্ঞানের লেভেল-১ এর কেরামতি ফাঁস হয়ে গেল। ড্রেসডেন শহরের দোকানপাটে কেউ একবিন্দু ইংরেজি বলতে পারে না। সুপার মার্কেটে গিয়ে প্রথম দিন ডিম কিনতে গিয়ে কোনোভাবেই সেলস গার্লকে বোঝাতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত লজ্জার মাথা খেয়ে মুরগির মতো ডাক পাড়লাম, সেটাতে কাজ হলো। দেশে গোয়েথেতে স্যার জার্মান পড়ানোর সময় কী সুন্দর করে নতুন দেশের ভাষায় কথা বলতেন। তখন মনে হতো, বাহ, অনেক কিছুই তো বুঝতে পারি, জার্মান ভাষা দেখি শিখেই ফেললাম বলে। এখানে এসে মনে হলো এরা সবাই যেন অন্য কোনো অজানা ভাষায় কথা বলে। এই ভাষা তো স্যার আমাদের শেখাননি! পাখির মতো শিখে না হয় দুই-একটা কথা বলা যায়, কিন্তু উত্তরটা তো বুঝতে পারতে হবে। এর মাঝে একদিন পথ খুঁজে না পেয়ে এক বুড়োকে জানতে চাইলাম বাসার ঠিকানা বলে। সে আমাকে অনেক সময় নিয়ে খুব সুন্দর করে সব বুঝিয়ে দিল। একটা বিন্দুও বুঝতে পারলাম না। বুড়ো আমার মুখ দেখে সেটা অনুমান করল মনে হলো। সে আবার প্রথম থেকে বোঝাতে শুরু করল। শেষমেশ দেখি মহাবিপদ, আমাকে না বুঝিয়ে বুড়ো ছাড়বে না। তৃতীয়বার বোঝানোর সময় সব বোঝার একটা ভাব করলাম, তারপর কোনক্রমে কেটে পড়লাম। নিজেরই দোষ, এই সামান্য জিনিস না বুঝতে পারলে পথ জানতে চাওয়া কেন!

গত ছয় মাসে যে কিছুই শিখিনি, তা নয়। ইউনিভার্সিটি থেকে ফ্রি কোর্স ছিল, সেখানে গেলাম নিয়মিত। পড়াশোনা আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে জার্মান শেখার একটা আপ্রাণ চেষ্টাও চালালাম। লাভের মধ্যে খেয়াল করলাম ইদানীং ইংরেজি ভুলে যাচ্ছি। ইদানিং ইংরেজি বলতে গিয়ে দুই একটা শব্দ জার্মান চলে আসছে নিজের অজান্তেই। আর জার্মান যে কিছুই শেখা হয়নি, সেটা অনুভব করি ক্লাস করতে গিয়ে। এই যেমন অনেকক্ষণ ধরে হাত-পা নেড়ে লেকচার দিচ্ছেন প্রফেসর ফিঙ্গার, মনে হচ্ছে ফ্লাইং সসার থেকে নেমে এসে কোনো এলিয়েন কথা বলছে। প্রায় কিছুই বুঝতে না পেরে মাঝে মাঝে পাশের জার্মান ছেলেটার কাছে বুঝতে চাইছিলাম। ব্যাপারটা ফিঙ্গার সাহেবের মনঃপূত হয়নি। একটু আগে লেখা সমীকরণের একটা অংশ মুছে দিয়ে হঠাৎ করে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালেন ক্লাসের দিকে। তাঁর সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিলাম। মনে মনে প্রার্থনা করলাম, “ধরণি দ্বিধা হও”। পাশ থেকে বন্ধুর কলমের খোঁচা খেয়ে খেয়াল করলাম, প্রফেসর আমাকেই কিছু একটা প্রশ্ন করেছেন। টেকনিক্যাল ব্যাপারটা হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারতাম, কিন্তু প্রশ্নই তো বুঝতে পারিনি। এখানে ক্লাসের ছাত্ররা সাধারণত বসেই শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দেয়। ভ্যাবাচেকা খেয়ে দাঁড়িয়ে মিনমিন করে ইংরেজিতে বললাম, দুঃখিত, আমি প্রশ্নটা বুঝতে পারিনি। তুমি কি আরেকবার বলবে?

প্রফেসর ফিঙ্গার খুব কড়া ভাষায় একটা কিছু বললেন। সেটাও বুঝতে না পেরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। সামনের সারিতে বসা কয়েকটা ইন্ডিয়ান ছেলে দেখি খুব সমজদারের মতো মাথা নাড়ছে, সেটা দেখে লজ্জায় মাথা কাটা গেল। প্যাট্রিক নামের জার্মান সহপাঠী পরে ব্যাখ্যা করল, ‘প্রফেসর বলছিলেন, জার্মান না জেনে এখানে কেন পড়তে আসা, ইংল্যান্ড আমেরিকা গেলেই তো হয়।’

জার্মানিতে আসার পর পৃথিবীর সব দেশের সাথে আমরাও পারি টাইপের অঘোষিত একটা যুদ্ধের ঘোষণা ছিল মনে মনে। মাস্টার্সের এই কোর্সে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মনে হলো দেশটাকে যেন খুব ছোট করে ফেললাম অন্যদের সামনে। সবাই এই বিষয় নিয়ে আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে করুক। এখন আমার সাথে সাথে আলোচনায় চলে আসবে বাংলাদেশের নামটাও। এটা হবার কথা ছিল না।

প্রফেসর ফিঙ্গারের ক্লাসে আর গেলাম না সারা সেমিস্টারে। শুধু তাই না, অন্য ক্লাসে যাওয়াও কমিয়ে দিলাম। লেকচার না বুঝে শুধু হাঁ করে তাকিয়ে থেকে কী লাভ। অন্য দেশের সাথে প্রতিযোগিতার ব্যাপারটা মাথা থেকে বের হয়ে গেল, বুঝতে পারলাম পাস করতেই ঠ্যালা আছে জার্মান শিখতে না পারলে।

চলবে…

অন্যান্য পর্ব ও লেখকের কথা 


লেখকের কথাঃ

ঠিক এক যুগ আগের কথা। ২০০১ সাল, আমরা তখন অনেক সেশন জটে জট পাকিয়ে অবশেষে চতুর্থ বর্ষের ছাত্র, পাশ করে আর কিছুদিন পরে উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশ যাব – এমন একটা স্বপ্ন চোখেমুখে । বুয়েটের স্ট্যান্ডার্ড নিয়ম আর ঐতিহ্য (!) মেনে মনে মনে এক পা প্রায় আমেরিকার পথে। টোফেল দেয়া শেষ, জিআরই নিয়ে বসব বসব করছি। এমন সময় আল কায়েদার আমেরিকার ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা (কিংবা কেউ কেউ বলেন আমেরিকার নিজের লোকদের করা প্ল্যানে ঘটানো কাজ, সে যাই হোক না কেন)।

আমরা যখন পাস করি করি তখন ভিসা দেওয়া তো দূরের কথা, আমেরিকার নামও মুখে আনা নিষেধ। স্কলারশিপ টিপ দিয়েও কোন কাজ হচ্ছে না এমন এক দুঃসময়! এমন একটা সময়ে একদম কোন কিছু না জেনে, প্রায় কোন জার্মান ভাষা না শিখেই ২০০২ সালের এপ্রিলের ৮ তারিখ পা দিলাম জার্মানির মাটিতে।

অনেক বছর শেষে পিছন ফিরে তাকিয়ে ইদানিং মনে হয় জীবন যদি আবার শুরু করতে পারতাম, আর ৯১১ যদি না ঘটতো আর যদি জানা থাকতো জার্মানিতে কি কি সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তাহলে চোখ বুজে আমারিকা কানাডা বাদ দিয়ে আবার জার্মানিতেই আসতাম। সেই প্রথম বছরগুলির সীমাহীন প্রতিকূলতা আর সম্পূর্ণ নতুন একটা ভাষা এবং কালচার শিখে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা – এইসব অভিজ্ঞতার আলো আমাদের নতুন প্রজন্মকে দিয়ে যাওয়া উচিত – এমন একটা উপলব্ধি থেকে লিখতে বসা।

কোনদিনও লেখক ছিলাম না। বুয়েটে ভর্তি হচ্ছিলাম এই সময়ের কথা, আমার সহধর্মিণী বলেছে ওঁ নাকি সেই সময়কার লেখা চিঠিগুলো পড়ে আমার প্রেমে পড়েছিল। তাঁর চাপাচাপিতে পড়ে এইসব হাবিজাবি লিখার অনুপ্রেরণা। কারো ভাল লাগলে এই সামান্য প্রচেষ্টা সার্থক মনে করব।

এই লেখাগুলি তাদের জন্য যারা অনেক বাঁধা আর প্রতিকুলতার মুখেও স্বপ্ন দেখতে ভুলে না, নিজের জন্য এবং নিজের দেশের জন্য। বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে যারা শেখালো, সেই শাহবাগের নির্ঘুম গনজনতার জন্য উৎসর্গিত থাকল এই লেখার প্রতিটি অক্ষর।

আদনান সাদেক, ২০১৩।

Print Friendly