আইনস্টাইনের শৈশব

 

দক্ষিণ জার্মানির দানিয়ু নদীর পশ্চিম পাড়ে উলম শহর।

এই শহরেই ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন আলবার্ট আইনস্টাইন। ছোট্ট শহর; এটি জার্মানির ব্যাভেরিয়া অঞ্চলের অন্তর্গত। আইনস্টাইন পরিবার বেশ সংগতি-সম্পন্ন ছিল। ‘আমার শৈশব-স্মৃতি বলতে কিছুই মনে পড়ে না।’ একথা তিনি নিজেই বলেছেন। উলম শহরে তাঁর বাবা হেরমান আইনস্টাইনের একটি কারখানা ছিলÑইলেকট্রো-টেকনিক্যাল ওয়ার্কস। তিনি ইঞ্জিনীয়ার ছিলেন। হেরমান ও তাঁর ভাই জ্যাকব দু’জনে মিলে এটি চালতেন। আলবার্টের বয়স যখন মাত্র এক বছর তখন হেরমানে দোকান উঠে যায়। তিনি দেউলিয়া হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়ে হেরমান ভাগ্যের সন্ধানে মুনিখে চলে যান। সেখানে তিনি ডায়নামো, আর্কল্যাম্প ও ননারকমের মাপজোকের যন্ত্রপাতি তৈরি করে বিক্রি করা শুরু করেন। এতে হেরমান লাভবান হতে থাকেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মুনিখের উপকণ্ঠে সেগুলিতে একটি বাগানবাড়ি কেনেন। এই বাড়িতেই ১৮৮১ সালে আলবার্টের কোন মেয়ের জন্ম হয়। শৈশবে দুই ভাইবোনের মধ্যে খুব ভাব ছিল। বাড়ির বাগানে দু’জনে একত্রে খেলা করতেন। শৈশবে তিন বছর বয়স পর্যন্ত আলবার্ট কথা বলতে শেখেননি। নয় দশ বছর বয়সেও তিনি কিছুটা থেমে থেমে কথা বলতেন। এতে পরিবারের লোকেরা যথেষ্ট চিন্তাগ্রস্ত হয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন হয়ত আলবার্ট বড় হয়ে জড়বুদ্ধি সম্পন্ন হবে। তাছাড়া আলবার্ট ছিলেন খুব শান্তবিষ্ট লাজুক। অন্যান্য সমবয়সীদের থেকে আলাদা। খেলাধুলো, দৌড়ঝাঁপ তিনি বিশেষ পছন্দ করতেন না। ছেলেবেলায় অনেক সময় বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে সৈন্যরা কুচকাওয়াজ করে বাজনা বাজিয়ে শোভাযাত্রা করে যেত। অন্য ছেলেরা এ দৃশ্য দেখার জন্য রাস্তার ধারে জমায়েত হতো। কোন ছেলেই বাদ যেত না। এর ব্যতিক্রম ছিলেন আলবার্ট। পরবর্তীকালে এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, সৈন্যদের কাজ হুকুমে যুদ্ধ করা। আর হুকুম তালিম করতে গিয়ে যুদ্ধে সাহসিকতা প্রমাণ করা। দেশপ্রেমের নামে যুদ্ধ করাকে আমি ঘৃণা করি। ছোট্ট সংসার; দুটি ছেলেমেয়েÑআলবার্ট ও মেয়া। আলবার্টের মা পলিন কক আইনস্টানার নিপুণ তত্ত্বাধানে সেই সংসারে শান্তি ছিল। পলিন খুব ভালো গান-বাজনা জানতেন; ছেলেকে তিনি ছ’ছর বয়স থেকেই বেহালা বাজানো শিখিয়েছিলেন! উত্তরকালে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বেহালা বাদকদের মধ্যে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন অন্যতম বলে গণ্য হয়েছিলেন। বেহালা ছিল তাঁর চিরজীবনের সঙ্গী।

আইনস্টাইন পরিবার জাতিতে জার্মান-ইহুদী ছিলেন। আলবার্টের বয়স যখন পাঁচ বছর তখন তাঁর বাবা সপবিারে মিলানে চলে আসেন এবং সেইখানেই বসবাস করতে থাকেন। কারখানাটিও মিলানে নিয়ে আসা হয়। পলিন নতুন করে সংসার পাতলেন এখানে। পবিারের সকলের সুখস্বাচ্ছন্দ্য বিমান ছিল তাঁর প্রধান কাজ, কিন্তু সেজন্য পিয়ানো বাজানো বাদ যেত না একদিনও। পুত্রকে পাশে বসিয়ে তিনি পিয়ানো বাজাতেনÑ আলবার্ট তন্ময় হয়ে মায়ের বাজানো শুনতেন। পলিন ছিলেন বীটোফেনের অনুরাগিনীÑপিয়ানোর বুক থেকে বীটোফেনের সুরলহরী যখন উঠতো তখন মুগ্ধ বালক তাঁর সমস্ত হৃদয় মন দিয়ে তা শুনতেন। কী এক অপার্থিব আনন্দ তাঁর সমস্ত সত্তা ভরে উঠতো। এই সঙ্গীতপ্রবণতা বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের প্রতিভার একটি বিশিষ্ট দিক। তিনি কিন্তু মোজাটের অনুরাগী ছিলেন।

জাতিতে ইহুদী হলেও আইনস্টাইন পরিবারের কেউ ঐ ধর্মের কোনো আচার-অনুষ্ঠান তেমন মানতেন না। মিলানে তাঁরা যেখানে থাকতেন সেখান থেকে ইহুদী ছেলেমেয়েদের জন্য স্কুলটা ছিল বেশ খানিকটা দূরে। সেইজন্য ছয় বছর বয়স হলে আলবার্টকে ক্যাথলিক খ্রীস্টানদের একটা স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। ঐ স্কুলটা তাঁদের বাড়ির কাছেই ছিল। আসলে সেটা ছিল একটা পাঠশালা। পাঠশালার পড়া শেষ হলে দশ বছর বয়সে তাঁক একটি স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হলো। লুইটপোল্ড জিমনাসিয়াম ছিল একটি উচ্চ বিদ্যালয়, এখানকার নিয়মকানুন ছিল খুব কঠোর। এখানে লাতিন ও গ্রীক পড়ানো হতো, কিন্তু আলবার্টের বিশেষ আগ্রহ ছিল না ঐ দুটি ভাষা শেখবার জন্য। ইতিহাসটা তাঁর কাছে খুবই নীরস মেনে হতো; ইতিহাসের সন-তারিখ কিছুতেই তিনি রাখতে পারতেন না। স্কুলে ছেলে কি রকম পড়াশুনো করছে। ভবিষ্যতে কী নিয়ে পড়াশেনো ছেলের পক্ষে উপযোগী হবে এই প্রশ্নে নিয়ে একদিন আলবার্টের পিতা গিয়েছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে। উত্তরে প্রধান শিক্ষক বলেছিলেন, এ ছেলেক যে কোন বিষয়েই পড়াতে পারেন। তবে কোন বিষয়েই সুবিধে করতে পারবে না। বেয়াড়া অমনোযোগী ছেলে।

তাঁর অনুসন্ধিৎসা প্রবৃত্তি ছিল অসাধারণ। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্বন্ধে কিশোরের মনে সব সময় অদ্ভুত ধরনের প্রশ্ন জাগত আর শিক্ষকদের কাছ থেকে তিনি সেইসব প্রশ্নের উত্তর প্রার্থনা করতেন। কেমন করে এই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে আর কেনই বা সৃষ্টি হয়েছেÑএইসব প্রশ্ন শুনে শিক্ষকগণ রীতিমত ব্যতিব্যস্ত হতেন। তাঁরা নিজেরাই এসব প্রশ্ন বুঝতেন না; তাই এর কী উত্তর দেবেন তাঁরা জানতেন না। এতকাল এখানে মাস্টারি করছেন, কখনো কোনো ছাত্রের কাছে থেকে তাঁরা এমন সব অদ্ভুত প্রশ্ন শোনেননি। কিন্তু এসব প্রশ্নের জবাব তিনি পেতেন বাড়িতে তাঁর বাবার কাছে, কাকা জ্যাকবের কাছে আর ম্যাক্স ট্যালমে নামক একটি রুশীয়-ইহদী ছেলের কাছ থেকে। ইনি ডাক্তারি পড়তেন আর প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁদের গৃহে নৈশভোজে আমন্ত্রিত হয়ে যোগদান করতে আসতেন। ম্যাক্সকে আলবার্ট ‘দাদা’ বলে ডাকতেন। ‘আপনার আলবার্ট’ একটি ক্ষণজন্মা; কী প্রকাণ্ড এর মাথা! বড়ো হয় ও একজন অসাধারণ মানুষ হবে।’ এই কথা একদিন ডিনার টেবিলে ম্যাক্স বলেছিলেন পলিন এবং তাঁর স্বামী হেরমান আইনস্টাইনকে।
এই ভবিষ্যদ্বাণী নিষ্ফল হয়নি।

সমস্ত পৃথিবীর মানুষ, পৃথিবীর সমস্ত বিজ্ঞানী সমাজ দেখেছে কী আশ্চর্য ভাবেই না সফল হয়েছিল এই ভবিষ্যদ্বাণীটি।
তাঁর ম্যাক্স দাদার কাছ থেকে কিশোর আলবার্ট একটি বই পেয়েছিলেন। বইটির নাম Force and Matter; লুডউইগ বুশনারের লেখা একটি বই পড়ার পর আলবার্টের মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত ধারণা জেগে উঠল; বাড়ি থেকে স্কুল আর স্কুল থেকে বাড়ি, এই যে প্রাত্যহিক জীবন এর চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো নক্ষত্র, মহাকর্ষ আর চুম্বকের জগৎ। প্রতিদিন তাঁর মনের মধে জাগ্রত একটি বিচিত্র প্রশ্নÑ‘কী ঘটতে পারে যদি কোনো একজন মানুষ একটি ঘরের মধ্যে একটি আলোক-রশ্মিকে বন্দী করে রাখে?’ বারো বছর বয়সে ইউব্লিডের জ্যামিতির সঙ্গে আলবার্টের পরিচয় ঘটেছিল। জ্যামিতির প্রত্যেকটি সমস্যা সমাধান করার পর তিনি আরো কঠিন সমস্যার সমাধানের জন্য উৎসাহ বোধ করতেন। তাঁর ম্যাক্স দাদার সহায়তায় আলবার্ট ক্লাসের ছাত্রদের পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং ক্লাসের ‘ফার্স্ট’ বয় বলে গণ্য হয়েছিলেন। স্কুলে কিন্তু দুটি বিষয়ে তিনি কিছুমাত্র আগ্রহ বোধ করতেন না সে দুটি লাতিন ও গ্রীক ভাষা।

বাড়িতে তাঁর বাবা, মা ও কাকা সবাই লক্ষ্য করতেন যে একমাত্র অঙ্কশাস্ত্রের প্রতি আলবার্টের ঝোঁক ছিল। আর ঝোঁক ছিল পিয়ানো ও বেহালার ওপর। এই দুটি ছিল তাঁর চিত্তবিনোদনের সহায়ক। দু’বছর বয়স থেকেই তিনি তাঁর মায়ের কাছে বেহারা বাজাতে শিখেছিলেন। মোজার্ট ছিলেন তাঁর প্রিয় সুরকার। পিয়ানোতে বসে তিনি খুব যতেœর সঙ্গে, অধ্যবসায়ের সঙ্গে অভ্যাস করতেন। উত্তরকালে আইনস্টাইন বলতেন ‘ঈশ্বরের সৃষ্টির তুলনাই মোজার্টের সুরসৃষ্টি।’

সুত্রঃ আলবার্ট আনস্টাইন – হাতেখড়ি।
লেখকঃ জিরো টু ইনফিনিটি

Print Friendly