বখুম: অপরূপ সৌন্দর্য ও সৎ মানুষ

 

পুরনো শিল্প সুবিধা এবং সবুজ পার্কের সংস্পর্শে বখুম শহরের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। আপনি যদি খোলা মনের মানুষ হন তাহলে এ শহরের সৌন্দর্য এবং এখানকার অধিবাসীদের সততা দেখে অভিভূত হবেন। বখুম শহর নগরকেন্দ্রিক Ruhr অঞ্চলে অবস্থিত, সাবেক শিল্প শক্তিকেন্দ্রের একটি এবং এখন ইউরোপের সংস্কৃতিক রাজধানীগুলোর একটি। বখুমের অধিবাসীদের তাদের শহরের সাথে অবশ্যই খুব বিশেষ সম্পর্ক থাকতে হবে। Ruhr  অঞ্চলে অবস্থিত এই সাবেক খনির এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল শহর ভবিষ্যতের নানা চ্যালেঞ্জের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে এবং এটা একটা কারণ যে কেন শহরের অধিবাসীরা তাদের শহরকে ভালবাসে। এর সব অপরুপ সৌন্দর্যের জন্য আপনি প্রথম দেখায় হয়তো বুঝতে পারবেন না যে কেন এ শহরকে সবাই এত ভালবাসে। জার্মান গায়ক হার্বার্ট গ্রোনেমেয়ার বখুম শহরকে নিয়ে বিখ্যাত একটি গান লিখেছিলেন, তার গানের কথাগুলো হলঃ “You’re no beauty, grey with work, you love yourself without make-up, you’re the honest type.” এটা অসাধারণ কিভাবে মাত্র কয়েক শব্দের মধ্যে বখুম শহরের সৌন্দর্যকে বর্ণনা করেছে – বিশেষ করে “সুন্দর, কিন্তু সৎ” এই শব্দ দুটির কথা না বললেই নয়।

ছবিঃ জার্মান মাইনিং মিউজিয়াম

ছবিঃ জার্মান মাইনিং মিউজিয়াম

বখুম শহরের তথ্য এবং পরিসংখ্যানঃ

অধিবাসীঃ ৩৬৩,০০০ জন

শিক্ষার্থীঃ ৫১,৯০০ জন

বিশ্ববিদ্যালয়ঃ ৫টি

মাসিক ভাড়াঃ ২৯০ ইউরো।

ওয়েবসাইটঃ www.bochum.de

Ruhr অঞ্চল জার্মানির ভারী শিল্প কেন্দ্র ছিল। এটি একটি কয়লা ও ইস্পাত উৎপাদনের অঞ্চল ছিল, যাকে “জার্মানির কালো ফুসফুস” বলা হতো। এই শহর তার খনি, ধাতু বিগলন চুল্লি এবং উইন্ডিং টাওয়ারের  জন্য পরিচিত ছিল। ইতোমধ্যে ‘Ruhrpott’  নিজেকে একটি সাংস্কৃতিক অঞ্চলে রুপান্তরিত করেছে- যা পাঁচ মিলিয়ন মানুষের আবাসস্থল এবং ২০১০ সালে ইউরোপের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে মনোনীত হয়েছিল।

রুহুয়ার বিশ্ববিদ্যালয় বখুম

রুহুয়ার বিশ্ববিদ্যালয় বখুম

শহরে মধ্যে হাঁটার সময়, আপনি এখনও বখুম শহরের শিল্প অতীতের নানা নিদর্শন দেখতে পাবেন। আগের খনির ভবনগুলো এখনও সেখানে রয়েছে, একসময় এর পাশের কারখানাগুলোতে ইস্পাত উৎপাদিত হতো এবং পাবগুলো ও যেখানে প্রাক্তন “Kumpel” খনির শ্রমিকরা এখনও দেখা করে। কারখানা এবং শ্রমিকদের ধূসর ও নিরানন্দ শহর ছিল বখুম। এর কর্মমুখর অতীতের ছাপ এখন এর পুরনো ভবনসমূহে স্পষ্ট বোঝা যায়। আপনাকে এখানে একটি মনোরম ঐতিহাসিক কেন্দ্র খুঁজতে হবে না। এমনকি শহরের প্রান্তে পাহাড়ের উপর অবস্থিত Ruhr বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য শৈলী, পরিষ্কার এবং কার্যকরীভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ১৯৭০ সাল  থেকে বক্সের মতো দেখতে ভবনগুলো ক্যাম্পাসে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। আপনি বখুমের সবচেয়ে বিখ্যাত জাদুঘর  Deutsches Bergbaumuseum এ অতীতের নানা নিদর্শন দেখতে পাবেন।

ইয়াহুন্ডারঠালা কনভেনশন সেন্টার

ইয়াহুন্ডারঠালা কনভেনশন সেন্টার

কয়লা খনি এ শহরের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল,তা এখানে আপনি অনুভব করতে পারবেন এবং কিছু দর্শকের চোখে অবসাদও দেখতে পাবেন। এছাড়াও আপনি Jahrhunderthalle এ অতীতের জাঁকজমকপূর্ণ ধারণা পাবেন, এটি এখন কনসার্ট এবং অনুষ্ঠানের জন্য একটি মিলনস্থল হিসেবে ব্যাবহার হয়।

বখুম শহরে বসবাসঃ

আপনি যদি Jahrhunderthalle  পরিদর্শন করতে চান, তাহলে আপনাকে অবশ্যই গ্রীষ্মকালে যেতে হবে। পাশের Westpark এ, আপনি পিকনিক করতে এবং খেলতে পারেন। এছাড়াও এখানে আপনি প্রচুর শিক্ষার্থীর দেখা পাবেন। আপনি যদি কোন নিঃশব্দ সকালে পার্কে হাঁটতে বের হন, তাহলে আপনি কাছাকাছি হাতুড়ের শব্দ শুনতে পাবেন। কারণ এখানে পুরনো দিনের মতো এখনও ইস্পাত উৎপাদিত হয়। আপনি প্রকৃতিকে আরও বেশি অনুভব করতে পারবেন বখুম শহরের দক্ষিণে Kemnader লেকে। লেকের চারপাশ জুড়ে প্রায় আট কিলোমিটার পথ আছে, যেখানে আপনি জগিং, ইনলাইন স্কেটিং, বাইকিং অথবা হাইকিং করতে পারেন। সেখানে সাঁতার কাটার অনুমতি দেওয়া হয় না, কিন্তু সেখানে আপনি একটি বৈঠা বাওয়া নৌকা বা ডিঙি নৌকা ভাড়া নিতে পারেন এবং পুরো হ্রদ ঘুরে দেখতে পারেন। যখন বখুম থেকে মানুষ বাইরে যায়, তারা  Bermuda Dreieck এ দেখা করে –

বারমুডা দ্রাইএক

বারমুডা দ্রাইএক

শহরের কেন্দ্রস্থলের প্রান্তে কিছু রাস্তা পাব, বার এবং ক্লাবে ভরা। অনেক মানুষ বাইরের টেবিলে বসে এবং গ্রীষ্মের আবহাওয়া উপভোগ করে। Alte Hattinger Strasse তে অবশ্যই দেখার মতো দুটি জায়গা হল অরল্যান্ডো এবং গোল্ডকান্তে। অরল্যান্ডো মনোরম পরিবেশের একটি অভিজাত ক্যাফে। বড়, পুরনো আরামকেদারা এবং খুব সুন্দরভাবে সাজানো আসবাবপত্র এই জায়গাকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। Goldkante একইসাথে একটি পাব, ক্লাব এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভেন্যু। এখানে  কনসার্ট,পার্টি এবং সব ধরণের ইভেন্ট হতে দেখা যায়, যেগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ ভাবে জনপ্রিয়।

গ্রীষ্মকালের প্রধান লক্ষণীয় বিষয় হল ‘Bochum Total’ উৎসব। আপনি কোন চার্জ ছাড়াই চার দিন পুরো শহর জুড়ে, সুপরিচিত এবং নতুন, নবাগত  বিভিন্ন ব্যান্ডের কনসার্ট উপভোগ করতে পারবেন। বখুম তার চমৎকার থিয়েটার এবং শিল্পকলা দৃশ্য সম্পাদনের জন্য সুপরিচিত।  Schauspielhaus বখুম শহরের বৃহত্তম থিয়েটার এবং এখানে থিয়েটার ক্লাসিক এবং আধুনিক নাটক মঞ্চস্থ হয়। Prinzregenttheater একটু ছোট, কিন্তু সে হিসাবে যথেষ্ট বিখ্যাত। শাস্ত্রীয় ও আধুনিক নাটক এই থিয়েটারে মঞ্চস্থ করা হয়। ‘Rottstraße 5’ থিয়েটারে মাঝে মাঝে কিছু পারফরমেন্স হয় যেগুলো খুবই অসাধারণ। বখুম থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞাসা করা ভাল,তারা কোন পারফরমেন্সটি দেখতে বা উপভোগ করতে বলেন।

বখুম টোটাল উৎসব

বখুম টোটাল উৎসব

বাস্তিয়ান রথের  টিপসঃ

‘Bermuda Dreieck’ এর ‘Max Frituur’ তে যাবেন এবং সেখানে ‘Fritjes’ খাবেন, যা একটি বিশেষ ধরনের চিপস, অন্তত তিনটি ভিন্ন স্বাদের চাটনি দিয়ে, যেমনঃ জাফরান বা Pili Pili।  বেশিরভাগ চাটনিই বাড়িতে বানানো এবং সবসময় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

উজবেকিস্তানের দিলাফ্রুযের সঙ্গে বাস্তিয়ান রথের সাক্ষাৎকারঃ

২৩ বছর বয়সী দিলাফ্রুয রাহিইভা উজবেকিস্তান থেকে এসেছেন এবং Ruhr-Universität Bochum (RUB) বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানে তার স্নাতক করছেন।

উজবেকিস্তানের দিলাফ্রুয

উজবেকিস্তানের দিলাফ্রুয

বাস্তিয়ানঃ কি কারণে আপনি বখুমকে  অধ্যয়ন করার জন্য বেছে নেন ?

দিলাফ্রুযঃ উজবেকিস্তানে আমার একজন জার্মান শিক্ষিকা ছিলেন যিনি আমাকে বখুম সম্পর্কে অনেক কিছু বলেছিলেন। তিনি- Ruhr-Universität এর সঙ্গে একটি শিক্ষক বিনিময় প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং এরপর থেকে আমিও বখুমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।

বাস্তিয়ানঃ আপনি কিভাবে জার্মানিতে থাকার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?

দিলাফ্রুযঃ আমি উজবেকিস্তানে জার্মান স্টাডিজ নিয়ে পড়াশোনা করেছিলাম এবং আমি গোয়েথে ইনস্টিটিউটে জার্মান ভাষার কোর্সও করেছিলাম।

সাওস্ফিলহাউস নাট্যমঞ্ছ

সাওস্ফিলহাউস নাট্যমঞ্ছ

বাস্তিয়ানঃ বিদেশী শিক্ষার্থীদের জার্মানিতে পড়াশোনা করতে আসার আগে কিসের প্রতি বেশি খেয়াল রাখতে হবে?

দিলাফ্রুযঃ তাদের অবশ্যই জার্মান ভাষার একটি কোর্স করতে হবে। জার্মান ভাষা খুব কঠিন এবং সেজন্যই আপনাকে ভাষার কোর্স করতে হবে যাতে আপনি সবকিছু আরো ভালভাবে বুঝতে পারেন।

বাস্তিয়ানঃ শুরুর দিকে জার্মানিতে আপনার জন্য সবচেয়ে কঠিন জিনিস কি ছিল ?

দিলাফ্রুযঃ জার্মান ভাষা এবং সংস্কৃতি। শুরুতে জার্মান ভাষা বুঝতে আমার খুবই কষ্ট হতো, কারণ সবাই খুব দ্রুত কথা বলে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটা ঠিক হয়ে গেছে এবং জার্মানির সবকিছু উজবেকিস্তান থেকে ভিন্ন। এমনকি আমার পড়াশোনার ক্ষেত্রেও। উজবেকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার জন্য সবকিছু নির্দিষ্ট নিয়মানুসারে ঠিক করা থাকে কিন্তু জার্মানিতে এসব বিষয়ে অনেক স্বাধীনতা রয়েছে, যা আমার খুবই পছন্দ।

বাস্তিয়ানঃ জার্মানদের সাথে কিভাবে মিশতে হবে? এ বিষয়ে আপনার কোন পরামর্শ আছে কি ?

দিলাফ্রুযঃ শুরুতে আমি খুবই চিন্তিত ছিলাম এজন্য যে তারা আমাকে বুঝতো না কারন আমি অত্যাধিক ভুল করতাম। কিন্তু পরে আমি ভাবলাম কী যায় আসে! সবাই আমাকে কোনভাবে বুঝতে পারে এবং এটা তাদের ভালো একটা দিক।

বাস্তিয়ানঃ বিশেষ করে এখানকার কোন বিষয়টা আপনার পছন্দ ?

দিলাফ্রুযঃ সবাই এখানে খুবই সহায়ক, যা আমার খুব ভালো লাগে। অধ্যাপকরাও খুব আন্তরিক। উদাহরণস্বরূপ, আমি যখন মৌখিক উপস্থাপনা করি তখন তাঁরা বুঝতে পারে আমার ভাষাগত কি কি ভুল হচ্ছে। অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও খুবই সহায়ক।

বাস্তিয়ানঃ বখুমের কোন বিষয়টা  আপনি পছন্দ করেন?

দিলাফ্রুযঃ আমার নিজেকে এখানে খুবই কমফোর্টেবল মনে হয়। আমি মিউনিখে গিয়েছিলাম একবার এবং সফরটি বেশ লম্বা ছিল। আমি যখন বখুমে ফিরে আসলাম, তখন আমি অনুভব করলাম, যে ফিরে আসতে পেরে আমি খুব খুশি। বখুম  বেশ ছোট হলেও এটা খুবই আন্তর্জাতিক মানের। বিশ্ববিদ্যালয়ে পছন্দ করার মতো অনেক অনেক আলাদা আলাদা বিষয় রয়েছে এবং আপনি সহজেই সেগুলোর জন্য রেজিস্টার করতে পারেন।

বাস্তিয়ানঃ বখুমে  আপনার প্রিয় জায়গা কোনটি ?

দিলাফ্রুযঃ Kemnader  লেক আমার কাছে বেশ সুন্দর মনে হয়েছে, সেখানে আপনি অবসর সময় কাটাতে পারেন।

 

সুত্রঃ study-in.de

অনুবাদকঃ সাজেদুর রহমান, রাজশাহী

 

Print Friendly