বার্লিন: নির্ঘুম সবুজ রাজধানী

 

কৃতজ্ঞতা জানায় এর বহুবিচিত্র সংস্কৃতি, সৃজনশীল বিচক্ষণতা এবং অগণিত বিনোদনমূলক সুযোগের প্রতি,বার্লিন শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। প্রকৃতপক্ষে, জার্মানির রাজধানীর চমৎকার আবহাওয়ামণ্ডল রয়েছে।যারা এই চমৎকার শহরে একবার এসেছেন তাদের পক্ষে এটাকে পুনরায় ছেড়ে চলে যাওয়া কঠিন। বার্লিন জার্মানির রাজধানী শহর।এবং এটা শুধুমাত্র দেশের রাজনৈতিক কেন্দ্রই নয় বরং ৩.৫ মিলিয়ন বাসিন্দার বৃহত্তম একটি শহর।

রাইখস্টাগ ভবন

রাইখস্টাগ ভবন

এই মহানগরী কখনও ঘুমায় না।আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় , বড় কর্পোরেশন এবং স্টার্ট-আপ কোম্পানী  সমূহের আবাসস্থল হলো বার্লিন।বার্লিন তার বহুসংস্কৃতি , উত্তেজনাপূর্ণ রাত এবং স্পন্দনশীল শিল্প দৃশ্যের জন্য সুপরিচিত।এর আন্তর্জাতিক মানের থিয়েটার এবং জাদুঘরের কথা না বললেই নয়।সহজ ভাষায় বললে, বার্লিন অসাধারণ একটি জায়গা।বার্লিন পুরো বিশ্ব জুড়ে সুনাম কুড়িয়েছে এবং বর্তমানে আগের তুলনায় অনেক বেশি। জার্মানির রাজধানীর অনেক বৈশিষ্ট্য আছে যেগুলো সংক্ষেপে বর্ণনা করা কঠিন।

স্টাচু অফ হামবোল্ট

স্টাচু অফ হামবোল্ট

বার্লিন শহরের তথ্য এবং পরিসংখ্যানঃ

অধিবাসী : ৩,৩২৬,০০০ জন

ছাত্র: ১৬৩,৫০০ জন

বিশ্ববিদ্যালয়: ৪০টি

মাসিক ভাড়া: ৩২১ ইউরো।

ওয়েবসাইট:  www.berlin.de

৬০টি গবেষণাগার ও ৪০টির অধিক উচ্চশিক্ষার  প্রতিষ্ঠানের সাথে, বার্লিন অত্যন্ত বিস্তৃত পরিসরে একাডেমিক এবং গবেষণার সুযোগ সুবিধা প্রদান করে।পুরো বিশ্বের বিভিন্ন যায়গার ২০০,০০০ মানুষ এই শহরে পড়াশোনা এবং কাজ করে।

বার্লিন বারোটি জেলা নিয়ে গঠিত। বার্লিনবাসী প্রায়ই এগুলোকে “kiez” বলে ডাকে, যার অর্থ একটি শহরের ভিতরে ছোট্ট একটি এলাকা এবং সেগুলো খুব কাছাকাছি অবস্থিত।উদাহরণস্বরূপ  Neukölln জেলার কথা ধরা যাক, এটি সমগ্র মানহাইম শহরের সমান বড়। বার্লিন খুবই সবুজ।পাশাপাশি অনেক পার্ক, বাগান এবং হ্রদের সংস্পর্শে পুরো শহরের দৃশ্য পাল্টে গেছে।flea মার্কেটগুলো খুবই জনপ্রিয় এবং এগুলোর কার্যক্রমের তালিকা বিশাল।অনেক মানুষ শহর এবং এর বিশেষ ছন্দ দ্বারা পুলকিত হয়। বিভিন্ন সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক পুরো শহরকে সমৃদ্ধ করেছে এবং অনন্যভাবে পরিবর্তন করেছে। বার্লিন তরুণ শিল্পীদের জন্য একটি মিলনস্থল।শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশই বিদেশী।

বার্লিনে বসবাস:

আপনি সম্পূর্ণ শহর জুড়ে শিক্ষার্থীদের দেখা পাবেন।অনেকে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে, অনেকে আবার পছন্দ করে না।শিক্ষার্থীদের বাসস্থান প্রাপ্যতা শহরের নানা বিষয়ের উপর নির্ভরশীল।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাড়ার পরিমাণ খুব দ্রুত বেড়ে গেছে। Kreuzberg  এবং Neukölln  জেলাগুলো দিন দিন আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর সেসব জেলায় থাকার প্রবণতা বেশি, যেখানে তাদের সহপাঠী শিক্ষার্থীরা বসবাস করে।অনেকে একসাথে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে।এই বিষয়গুলোতে, বার্লিন সাধারণত অন্য বিশ্ববিদ্যালয় শহরগুলোর মতো না।শহরের বিশাল আকৃতি আপনাকে বিস্মিত করবে, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের প্রোগ্রামগুলোর বিজ্ঞাপন প্রচার করে যার ফলে আপনি দ্রুত আবেদন করার ক্ষেত্রে সাহায্য পেতে পারেন।

Martin-Gropius-Bau মিউজিয়াম

Martin-Gropius-Bau মিউজিয়াম

অনেক বড় শহর হওয়া সত্ত্বেও তার অধিকতর সহজবোধ্য পরিকাঠামোর জন্য, আপনি বার্লিনের রাস্তাগুলো দ্রুত খুঁজে পাবেন।পাবলিক পরিবহন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভাল মাধ্যম।আপনি আপনার সেমিস্টারে টিকেট দিয়ে বিনামূল্যে শহরের সীমার মধ্যে সর্বত্র ভ্রমণ করতে পারবেন। আসলে, বার্লিনের পাবলিক পরিবহনসমূহ প্রতিদিন এত কিলোমিটার পর্যন্ত চলে যে তাদের ট্রেন একদিনে পুরো পৃথিবী প্রায় ১৬ বার ঘুরে আসতে পারে! আপনি যদি আপনার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরে বসবাস করেন, তাহলে আপনাকে ক্লাস পেতে সর্বোচ্চ এক ঘন্টা ট্রেনে যাত্রা করতে হতে পারে।

বার্লিন একটি সবুজ নগরী। অগণিত পার্কসমূহ এর নিজস্ব অনন্য আবহাওয়ার সাথে মিশে আছে। যেমন, Mauerpark  তার flea market এবং কারাওকে  ইভেন্টের জন্য বিখ্যাত। আপনি যদি বার্লিনের জীবনের অস্থির গতি থেকে অব্যাহতি পেতে চান ,তাহলে  আপনাকে খুব একটা দূরে যেতে হবে না।R&R এলাকায় বার্লিনের অনেক swimming lake আছে।

অপেরা, কনসার্ট, নাটক, শো, কবিতা পাঠ, রিডিং, স্ট্রীট ফেস্টিভ্যাল- এইসব অনুষ্ঠানে অনেক কিছু করার আছে, যা এই  ইভেন্ট ক্যালেন্ডার এ পাবেন।এমন কিছু কিছু দিন আছে যখন জাদুঘর বিনামূল্যে পরিদর্শন করতে দেয় বা মুভি টিকেটে ছাড় দেয়া হয়। একজন ছাত্র হিসেবে আপনি প্রায় সবসময় টিকেটে ছাড় পাবেন, উদাহরণস্বরূপ “Berliner Ensemble” এবং Schaubühne এর মত থিয়েটারগুলোতে। এছাড়াও কিছু মুভি থিয়েটার আছে যেগুলো ছায়াছবি দেখানোর জন্য খুব কম সাবস্ক্রিপশন চার্জ নেয়।

কার্নিভাল সংস্কৃতি

কার্নিভাল সংস্কৃতি

রাতে যদি কখনও বাইরে যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেন,তাহলে শহরে অগণিত জায়গা আছে যেখানে যেতে পারেন।বার্লিনের জীবনযাত্রার মান খুব গোছানো ।সমুদ্র সৈকতের বার, উৎসব, open air concerts (এমনকি শীতকালেও) সমূহ সবসময়ই জনপ্রিয়।বার্লিনে একটি ক্লাব আছে যেখানে আপনি সম্ভাব্য সব ধরনের সঙ্গীতের স্বাদ নিতে পারেন। তবে, বার্লিন আসলে তার বৈদ্যুতিক সঙ্গীত দৃশ্যের জন্য সুপরিচিত।

খাবারের ব্যাপারে যতদুর বলা যায়, আপনি আপনার স্বাদ এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সবকিছু এখানে পাবেন।খাবার জন্য খুব ভালো দুটি জায়গা আছে সেগুলো হল,  Markthalle Neun তে StreetFood Thursday  এবং Thai Meadow in the Preussenpark ।আপনার যদি তাজা সবজি এবং মশলার প্রয়োজন হয়,তাহলে সাপ্তাহিক বাজারে যেতে পারেন,যেমন একটা  Maybachufer এ আছে। বার্লিনবাসী রবিবার শহরের অনেক ক্যাফের মধ্যে যেকোনো একটিতে দুপুরে খাওয়ার জন্য দেখা করতে পছন্দ করে।শহরের প্রায় প্রতিটি রাস্তার বাঁকে সাশ্রয়ী খাওয়ার জায়গা আছে এবং সেগুলোতে পছন্দমত সবকিছু অর্ডার করতে পারেন। Curried sausages এবং Doner  কাবাব এই দুটি সাধারণত সবার বিশেষ পছন্দ।আপনি কিছু যদি বৈচিত্র্য চান এবং খুব বেশি খরচ করতে না চান, তাহলে এসবের বিকল্প হিসেবে  স্টুডেন্ট ডাইনিং হল খুবই ভাল।

জো গ্রাফের টিপসঃ

আমি বার্লিন এর শিল্প দৃশ্য ভালোবাসি কারণ এটা অত্যন্ত বিচিত্র।আমি শহরে মাঝে মাঝে হওয়া এসব প্রদর্শনীর যেকোনো একটিতে যেতে বলবো। আমি সম্প্রতি এ চীনা শিল্পী Ai Weiwei  এর বিভিন্ন শিল্পকর্ম নিয়ে একটি বিশেষ প্রদর্শনী দেখেছি  Martin-Gropius-Bau তে।

নেপালের কৃশার সঙ্গে জো গ্রাফের সাক্ষাৎকার

২৬ বছর বয়সী কৃশা স্থাপিট নেপাল থেকে এসেছেন। তিনি বর্তমানে TU বার্লিনে “Technical Environmental Protection” বিষয়ে মাস্টার্স করছেন।

নেপালের  কৃশা স্থাপিত

নেপালের  কৃশা স্থাপিত

জো গ্রাফঃ বার্লিনের কোন বিষয়টা আপনার পছন্দ?

কৃশাঃ বার্লিনের বৈচিত্র্য।আপনি সহজেই  এখানে অনেক কিছু আবিষ্কার করতে পারবেন।এখানে সবসময় কিছু না কিছু হতে থাকে এবং সেগুলো সব সাধ্যের মধ্যে।প্রতিটি “kiez” ভিন্ন। আমার পরামর্শ হলো, কি ঘটছে তা খুঁজে বের করুন, পার্কে যান এবং বার্লিনে জীবনকে সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করুন।

জো গ্রাফঃ আপনি কিভাবে জার্মানিতে এসেছিলেন?

কৃশাঃ জার্মানিতে আমি  ছয় বছর ধরে আছি। অনেক নেপালী উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়াতে যায় – আমিও মূলত এটাই পরিকল্পনা করেছিলাম। বিশেষ করে জার্মান ভাষার কারণে। কিন্তু পরে জার্মানিতে থাকা আমার চাচা, আমাকে জার্মানিতে আসার জন্য মানায়।এখানে কোন টিউশন ফি নাই এবং বসবাসের খরচ অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। আমি জার্মান ভাষার একটা ইনটেনসিভ কোর্স করেছিলাম এবং তারপর নিজে নিজেই শেখা অব্যাহত রাখি। আমার চাচী নেপালি ভাষার একটা শব্দও বলতে পারতো না, তাই আমাকে খুব শিঘ্রই জার্মান ভাষায় কথা বলা শিখতে হয়েছিল। অবশ্যই, প্রথমে সবকিছু অদ্ভুত ছিল। মানুষের কাছ থকে আমার দেখে নিতে হতো কিভাবে এখানে খেতে হয়, কেনাকাটা করতে হয়, পাবলিক পরিবহন ব্যবহার করতে হয়।

পার্ক

পার্ক

জো গ্রাফঃ এখানে বসবাসে অভ্যস্থ হতে কোন জিনিসটা আপনাকে সাহায্য করেছে?

কৃশাঃ প্রথমেই আমার পরিবার । এবং তারপর আমার বসবাসের জন্য একটি স্টুডেন্ট হলে উঠা।এবং জার্মান-নেপাল সোসাইটি।এরকম অনেক সংগঠন আছে যারা বিভিন্ন ধরনের প্রথাগত ইভেন্ট হোস্ট করে,সেখানে আপনি অনেক মানুষের সাথে দেখা করতে পারেন। আমি ছোট একটি রেস্টুরেন্টে কাজও করি।এখনও সেখানকার লোকদের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক আছে। এবং তারপর পাঁচ বছর আগে, আমার সাথে আমার বর্তমান প্রেমিকের দেখা হয়।

 

সুত্রঃ study-in.de

অনুবাদকঃ সাজেদুর রহমান, রাজশাহী।

Print Friendly