বার্লিনঃ পড়ার জন্য, শুধু চাকরির জন্য নয়।

 

একটা ছেলে আমাকে মেসেজ দিয়ে বলল, ভাইয়া বার্লিনে যেতে চাই, আপনার কি মতামত।
আমি বলি, বার্লিনেই কেন? অন্য কোথাও চেষ্টা করনি?

-ওখানে অনেক জব পাওয়া যায়। চাকরি করে সব খরচ তুলে ফেলা যাবে। দেশেও টাকা পাঠানো যাবে। জার্মানি মানেই তো প্রথমেই বার্লিন। আপনি কি বলেন?

আমি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলি, বার্লিনের চেয়েও অনেক ভাল শহর আছে। আমি নিজে হলে আগে বার্লিন বাদ দিয়ে অন্য শহর খুঁজতাম। এখানে ভাল পছন্দমতো বিষয় পেলে অন্য কথা। তবে চাকরি পাওয়া সহজ এই যুক্তিতে বার্লিন যাওয়া ঠিক হবে না।

– ভাই, রাজধানী শহর তো বার্লিন। টিভিতে দেখায়, খবরের কাগজে নাম আসে। আমার বড় মামাতো ভাই গেছে দুই বছর আগে। সবসময় কাজ পায়। কাজের চাপে দেশে কথা বলার পর্যন্ত সময় পায় না।
– তাহলে তো আর আমাকে জিজ্ঞেস করার কিছু নেই। তুমি মনস্থির করেই ফেলেছ।
– ভাই, আপনি বললে একটু মনে সাহস পাই।
– সাহস দিতে পারছি না। বার্লিনে যেও না।

ছেলেটা মন খারাপ করে আমার সাথে আর যোগাযোগ করে নি। বেশ কিছুদিন পরে সে দক্ষিণের ছোট একটা শহর থেকে ইমেইল করল। ভাইয়া, আপনার কথামতো বার্লিনে না গিয়ে এখানে এসেছি। কোন কাজ পাচ্ছি না, মামাতো ভাই বলেছে বার্লিনে চলে যেতে। কি করব বুঝতে পারছি না।

আমি দেখলাম মহা বিপদ। বাংলাদেশে যেমন সব চাকরির কেন্দ্র ঢাকাতে, এই দেশে সেটা নয়। যে দেশ যত উন্নত, তাদের রাজধানী অর্থনৈতিক দিক থেকে ততটাই গুরুত্বহীন। বার্লিনও সেরকম। জার্মানির সবচেয়ে বড় শহর, মানুষের সংখ্যা অন্য যেকোনো শহরের চেয়ে বেশী। যতদূর মনে হয় রেস্টুরেন্ট টাইপ অড চাকরি পেতে সমস্যা হয় না। এছাড়া বাংলাদেশী আছে অনেক। পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে ছেলেমেয়েদের অনেক ধরণের ভোগান্তি পোহাতে হয়। বার্লিনে বাংলাদেশের এম্ব্যাসি থাকাতে অনেকের জন্য এটা একটা স্বস্তির বিষয়। তারপরেও আমি ছেলেটাকে বার্লিনে না যেতে বলেছি।
এর পেছনে আমার কিছু যুক্তি আছে।

যেসব ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যায়, তাদের উচিত যথা সম্ভব মস্তিষ্কের ব্যবহার হয় এমন ধরণের কাজ করা। বিদেশে দেশের মতন ধরাবাঁধা সাজেশন দিয়ে পড়া শেষ করা সম্ভব নয়। এখানে নিজের কিছুটা স্বকীয়তার দরকার আছে। রেস্টুরেন্টের থালা বাটি ধোয়া মোছাতে তেমন কোন মাথার কাজ হয় না। বার্লিনে মানুষের অনুপাতে বড় ধরণের স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রির সংখ্যা আশঙ্কাজনক ভাবে কম। সুতরাং কার্যত গবেষণা মূলক বা কারখানায় বুদ্ধি খাটিয়ে করতে হয় এমন কাজের সংখ্যা কম। অন্যদিকে অড জব বা শারীরিক শ্রম দিয়ে করা যায় এই ধরণের কাজ বেশী। সুতরাং সহজেই ছেলেমেয়েরা অড জবে আকর্ষিত হবে। এবং ফলাফল হল, মস্তিষ্কের কাজ না করাতে নিজের পড়াশোনায় তারা পিছিয়ে পড়তে থাকবে। একটা সময়ে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফুল টাইম শ্রমজীবী হয়ে যাবার আশংকা খুবই বেশী।

বার্লিনে দেশীয় রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় প্রচলিত বেতনের অর্ধেক টাকায় কাজ করছে অনেক বাংলাদেশী এমন ঘটনা শোনা যায়। অর্ধেক পয়সায় কেন, বিনামূল্যেও যদি পড়ার সাথে সম্পর্ক আছে এমন বিষয় নিয়ে কেউ কাজ করত, তাহলে অন্তত তাদের ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগত।
আরেকটা সমস্যা বার্লিনের মতন বড় শহরগুলিতে। বাংলাদেশী বেশী হওয়াতে সারাদিনের কার্যক্রমে সবকিছুতে দেশী মানুষের সাথে হয়। ফলাফলে দেখা যায় অনেক বছর জার্মানিতে থেকেও সামান্য জার্মান শেখা বা চর্চা করা হয় না।

এমনটা নয় যে বার্লিনে ভাল কোন বিশ্ববিদ্যালয় নেই, বা সেখানে পড়াশোনা করে কেউ ভাল করছে না। তবে আমার দেখাতে প্রায় ৯০ শতাংশ ছেলেপেলে বার্লিনে যায় সেখানে কাজ পাওয়া সহজ এই কারণে। সেখানে ভাল বা পছন্দের বিষয়ে পড়তে পারবে – এইজন্য নয়। এই খানেই আমার সমস্যা।
এই গল্পের শেষটা সেই ছেলেটার গল্প দিয়ে নয়, বরং একটা সামান্য পরিসংখ্যান দিয়ে। জার্মানিতে বেকার মানুষের সংখ্যার দিক থেকে করা তালিকায় বার্লিন প্রায় সবার পেছনে। এর অর্থ বার্লিনের অর্থনৈতিক অবস্থা জার্মানির বেশীরভাগ অঞ্চলের চেয়ে খারাপ। যেখানে স্থানীয় বেকারের সংখ্যা বেশী, সেখানে বিদেশীদের চাকরি পাওয়া সহজ হবার কোন কারণ নেই।

প্রদেশভিত্তিক বেকারত্বের হার, ২০১৪

বেকারত্বের হার ২০১৬

ছবিতে যেখানে যত বেশী বেকারত্ব, সেখানে তত বেশী গাড় লাল। যত বেশী হালকা, তত বেশী অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী অঞ্চল। ২০১৪ সালের বার্লিনের বেকারত্বের হার বেড়ে ২০১৬ তে প্রায় ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

পুনশ্চঃ গল্পের ছেলেটি অনেক কষ্টে পড়াশোনা শেষ করে প্রায় সাথে সাথে চাকরি পেয়েছে। মোটামুটি ভাল জার্মান বলতে পারে। এবং মাঝে মাঝেই তার বার্লিনে থাকা মামাতো ভাইকে দেখতে যায়। তার ভাষায় বার্লিন অসাধারণ একটা টুরিস্টিক শহর। না গেলে বিশাল মিস। মামাতো ভাই অবশ্য তার দুই বছর আগে জার্মানিতে এসেও এখনও পড়া শেষ করতে পারে নি। তবে এই নিয়ে তাকে খুব বেশী চিন্তিত বলে মনে হচ্ছে না।

#BSAAG_Diary_of_Germany
‪#‎BSAAG_Life_in_Germany

#BSAAG_Finding_the_Right_University
#BSAAG_Finding_the_Right_Study_Programme

 

আদনান সাদেক, ২০.১০.২০১৬

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply