তারুন্যে ভরা ঐতিহাসিক আউগসবুর্গ

 

কয়েক শত বছর আগে, পরিদর্শনকারীরা আউগসবুর্গ কে জার্মানির  “ছোট্ট ইতালি”  বলে বর্ণনা করতো। ঐতিহাসিক সিটি সেন্টার , অনেক উদ্যান এবং আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়, সবমিলিয়ে আউগসবুর্গ ছাত্রদের জন্য একটি আকর্ষণীয় এবং সাশ্রয়ী একটি শহর।

আপনি প্রথম যখন এই শহরে হাঁটতে বের হবেন তখন আউগসবুর্গকে আপনার খুবই ভালো লাগবে। পুরনো সব খাল এবং ঐতিহাসিক সব ভবনের মাঝ দিয়ে সরু গলি আর ছোট ছোট সেতুর উপর আপনি হাঁটতে হাঁটতে সুন্দর মনোরম ঐতিহাসিক সিটি সেন্টার খুজে পাবেন।আউগসবুর্গ জার্মানির দ্বিতীয় প্রাচীনতম শহর, যার বয়স এখন প্রায় ২,০০০ বছর। অনেকদিন আগে এটি উত্তর ইউরোপের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল।

তথ্য ও পরিসংখ্যানঃ

অধিবাসীঃ ২৬৯,০০০

ছাত্র/ছাত্রীঃ ২৪,৮০০

বিশ্ববিদ্যালয়ঃ ২

মাসিক ভাড়াঃ ২৮০-৩০০ ইউরো

ছবিঃ বিখ্যাত সেইন্ট উলরিখ ও সেইন্ট আফ্রা মঠ

আউগসবুর্গ এর সুন্দর আবহাওয়ার জন্য সুপরিচিত। সিটি হলের সামনে – Rathausplatz Square এ আপনি শহরের বিখ্যাত সব দর্শনীয় যায়গা গুলি দেখতে পাবেন। আপনি বাজারের ফুটপাথে নিজের জন্য একটি আরামদায়ক জায়গা খুঁজে নিয়ে স্ট্রিট মিউজিশিয়ানদের গান শুনতে পারেন এবং ঐতিহাসিক সিটি হল, ক্যাথেড্রাল ইতাদির মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। আপনার ভাগ্য ভালো থাকলে দিগন্তজোড়া সুন্দর আকাশ দেখতে পাবেন।সবচেয়ে কাছের পার্কে যাবার জন্য আপনাকে খুব একটা  দূরে যেতে হবে না। আপনি  শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে হেটে সহজেই Altstadtring বা Stadtwald এ যেতে পারেন সাথে ভেষজ বাগানেও যেতে পারেন।

বিখ্যাত জার্মান নাট্যকার বারটোল্ট ব্রেখট আউগসবুর্গে জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি যে বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছেন সেটিতে বর্তমানে তার বিভিন্ন কাজ এবং তার জীবনের নানা বিষয় নিয়ে একটি জাদুঘর  তৈরি করা হয়েছে। আমরা আপনাকে মজার্টের বাড়িও ঘুরে আসতে বলবো, যেখানে  উলফগ্যাং অ্যামাডিউস মজার্টের পিতা লিওপোল্ড জন্মগ্রহণ করেন।এখন সে বাড়িটি মজার্টের পরিবারের স্মৃতির স্মারক এবং বিভিন্ন লেকচার ও কনসার্টের আয়োজন করার জন্য ব্যাবহৃত হয়। উলফগ্যাং অ্যামাডিউস ঘন ঘন আউগসবুর্গে যেতেন এবং পাশাপাশি সেখানে কনসার্টও করতেন।স্যাল্জবুর্গ এবং ভিয়েনার পর, আউগসবুর্গ এই সুরকারের  জীবনের তৃতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল।

ছবিঃ ব্রেখটহাউস এর খাল

আউগসবুর্গে বসবাসঃ

বসবাস করার জন্য আউগসবুর্গ দারুন একটি জায়গা – এটা উত্তেজনাপূর্ণ এবং সাশ্রয়ী , খুব একটা ব্যায়বহুল শহর না। পাশের শহর মিউনিখের সাথে তুলনা করলে ,শহরের কেন্দ্রস্থলে বাড়ি ভাড়া অনেক কম। বার এবং রেস্টুরেন্ট সমূহ  জার্মারনির  অন্যান্য সব প্রধান শহরের তুলনায় অনেক সস্তা। তবুও আউগসবুর্গের  সাংস্কৃতিক বিস্তার খুব ভালো।

ছবিঃ টাউন হল স্কয়ার

আপনি যদি আউগসবুর্গে বসবাস করেন , তাহলে আপনার অবশ্যই  “Fugger” সম্পর্কে কিছু জানা উচিত। আউগসবুর্গকে  প্রায়ই ” Fugger city ” বলে ডাকা হতো। Fugger একটি সুপরিচিত ব্যাবসায়িক পরিবারের  শেষ নাম ছিল যারা মধ্য যুগে অত্যন্ত ধনী হয়ে উঠেছিলো। তারা শহরের অনেক ঐতিহাসিক ভবন এবং খালসমূহ নির্মাণ করেছিল। উল্লেখযোগ্য  উদাহরণ হল  Fugger houses  যা আউগসবুর্গ শহরের কেন্দ্রস্থলে Maximilianstrasse তে অবস্থিত।সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আমরা আপনাকে একটি দিন  আউগসবুর্গ চিড়িয়াখানা তে কাটাতে বলবো। বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানার পাশেই অবস্থিত।গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যায় বোটানিক্যাল গার্ডেন খুব সুন্দর মনোরম আলোয় আলকিত হয়,তখন অবশ্যই সেখানে যাওয়া উচিৎ। Rotes Tor এ খোলা আকাশের নিচে ১৯১৯ সালে নির্মিত স্টেজ ,অবশ্যই দেখার মতো একটা জিনিষ। গ্রীষ্মের মাসগুলোতে  আপনি সেখানে অপেরা, ক্ষুদ্র গীতিনাট্য এবং সঙ্গীতানুষ্ঠান দেখতে পারেন এবং সেখানে জার্মানির সুপরিচিত শিল্পী ও ব্যান্ডদলের কনসার্ট এবং ইভেন্টগুলোতেও যেতে পারেন। এবং বিশ্ব-বিখ্যাত Augsburger Puppenkiste  এর কথা ভুলবেন না ।

শহরের কেন্দ্রস্থলে সর্বত্র অনেক ক্যাফে আছে যেখানে আপনি আড্ডা দিতে পারেন এবং অবসর সময় কাটাতে পারেন।বেশিরভাগ  বার, ক্লাব এবং রেস্টুরেন্টে আপনি হেঁটেই যেতে পারবেন। এছাড়াও আপনার আউগসবুর্গের বিয়ার বাগান গুলোর একটিতে অবশ্যই যাওয়া উচিৎ। উদাহরণস্বরূপ Drei Königinnen এ,ছায়াময় বাদামী গাছ নিচে বসে আপনি স্থানীয় বিয়ার অথবা কোমল পানীয় উপভোগ করতে পারেন।আপনি যদি “শহরকে লাল রঙে রঞ্জিত” করতে চান, তাহলে আপনি Liquidclub বা Mo Clubএ অনেক ছাত্রের দেখা পাবেন। গ্রীষ্মে  Festival der Kulturen অথবা Augsburger Jazzsommer উৎসবে আপনি সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত বাইরে পার্টি করতে পারেন।

জেনির টিপঃ 

রৌদ্রজ্জ্বল কোন সপ্তহান্তে আপনার অঞ্চলের কাছাকাছি জায়গাগুলোতে একটি সাইকেল ট্যুরে যেতে পারেন। আমি Bobingen এ একটি ট্যুরে যেতে বলবো, এবং শুধুমাত্র মনকাড়া প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য নয়,  আপনাকে ছোট গ্রামের St. Felicity এর গির্জায়ও যেতে বলবো।

সেখানে জেনি স্পেনের রাক্যুয়েল এর সঙ্গে কথা বলেছেন কিছু বিষয় নিয়ে, দেখুন তার সাথে সাক্ষাতকারঃ

২৩ বছর বয়সী রাক্যুয়েল গার্সিয়া রুবিও, স্পেন থেকে এসেছেন, এবং আউগসবুর্গ  বিশ্ববিদ্যালয়ে  Application-Oriented Intercultural Linguistics (ANIS) বিষয়ে স্নাতক করছেন।

স্পেনের রাক্যুয়েল গার্সিয়া রুবিও

কেন আপনি পড়াশোনা করতে জার্মানি এসেছেন? একথার প্রেক্ষিতে রাক্যুয়েল বলেছেনঃ

আমার সবসময় ভাষার প্রতি আগ্রহ ছিল।আমার বাবা এখানে চাকুরী পাওয়ার কারণে,আমার পরিবার আউগসবুর্গে চলে আসলে, আমি এখানে পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নেই।এমনিতেই আমি মিউনিখে পড়তে যেতে পারতাম, কিন্তু আমার আউগসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর ডিগ্রী প্রোগ্রাম মিউনিখের চেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে।.

জার্মানিতে থাকার জন্য আপনি কিভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?

সৌভাগ্যবশত আমার থাকার যায়গা  খোঁজার জন্য চিন্তা করতে হয়নি, কিন্তু আমি শহর এবং ডিগ্রী প্রোগ্রাম সম্পর্কে অনেক তধ্য সংগ্রহ করেছিলাম। আমি স্পেনে থাকার সময়, জার্মান ভাষার কোর্স করেছিলাম এবং বি১-সি-১ পর্যন্ত শিখেছিলাম এবং অবশ্যই আমি সবাইকে এ পর্যন্ত ভাষা শিখে আসতে বলবো।অবশ্য, একবার আপনি জার্মানিতে চলে আসলে ভাষা শিখে যাবেন, কিন্তু জার্মান ভাষার কোনো মৌলিক জ্ঞান ছাড়া ভাষা শেখা কষ্টসাধ্য ব্যাপার।আমি TestDaF জন্য একটি প্রস্তুতিমূলক কোর্স করেছিলাম,যেটা বিদেশী ছাত্রদের পাস করতে হবে যদি তারা আউগসবুর্গে পড়তে চায়।এছাড়া সমস্ত রেজিস্ট্রেশন ফর্মসমূহ  ঠিকমত বুঝতে হলে আপনার জার্মান জানা  প্রয়োজন।আমার সবকিছু গুছানোর জন্য খুব অল্প সময় ছিল।সময় নিয়ে সবকিছু ঠিক করুন এবং ভর্তি হবার জন্য আপনার ঠিক কোন তথ্যগুলো দরকার তা জেনে নিন যাতে কোনকিছু ভুল না হয়, আপনার সাবধানে সবকিছু পরিকল্পনা উচিৎ।

আউসবার্গের পুতুল নাচ

আপনি কি সহজেই আউগসবুর্গে বসতি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন ?

আউগসবুর্গ ছোট একটি শহর, কিন্তু আপনার প্রয়োজনের সবকিছু এখানে আছে। আপনি পাবলিক পরিবহনের মাধ্যমে খুব দ্রুত অধিকাংশ জায়গাতে পৌঁছতে পারবেন এবং ভাড়া, খাবার ,বিনোদনের খরচ মিউনিখের তুলনায় অনেক কম। আউগসবুর্গ খুব ভাল জায়গাতে অবস্থিত এখান থেকে আপনি অন্যান্য গন্তব্যস্থলেও দ্রুত পৌঁছতে পারবেন, ট্রেন সংযোগ খুবই ভাল, এবং পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য আপনাকে খুব একটা দূরে যেতে হবে না।

কিভাবে আপনি  বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দ করলেন ?

আমার বিশ্ববিদ্যালয়টি খুবই পছন্দ হয়েছে! বেছে নেবার জন্য এখানে অনেক ডিগ্রী প্রোগ্রাম রয়েছে, প্রচুর আন্তর্জাতিক ছাত্র এবং খুবই উচ্চ মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই খুবই আন্তরিক, এবং আমি প্রায়ই সেসব মানুষদের সাথে দেখা করতাম যাদের বন্ধুরা আগে থেকেই আমার বন্ধু।আমি খুব দ্রুত জার্মানদের সম্পর্কে জানতে শুরু করেছিলাম, যা আমার জার্মান ভাষা উন্নত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের  Tandem Programme আমার বিশেষ সহায়ক ছিল।

জার্মানিতে আপনি কিভাবে আপনার খরচ চালিয়েছিলেন ?

আমি ভাগ্যবতী ছিলাম -যে শুরুর দিকে আমার বাবা আমার পড়াশোনার খরচ বহন করেছিলেন। কিন্তু পরে আমি পার্ট-টাইম জব করতে শুরু করি এবং নিজে সবকিছু পরিশোধ করতে শুরু করি। অনেক ওয়েবসাইট আছে,Jobmensa, এর মতো যেখানে তারা ছাত্রদের জন্য চাকরীর খবর প্রচার করে। কিন্তু তারা বিশেষত জার্মান  ভাষায় খুব ভাল দক্ষতা চায়। সেমিস্টার ফি খুবই কম এবং এর মধ্যে সেমিস্টার টিকেটও অন্তর্ভুক্ত থাকে, এটি আপনি পাবলিক পরিবহনে ব্যবহার করতে পারবেন,রাতের বাসগুলো বাদে।

 

সুত্রঃ study-in.de

অনুবাদ করেছেনঃ সাজেদুর রহমান, রাজশাহী 

Print Friendly