এজেন্সি ও একটি ফোন কল

 

গত এক সপ্তাহে দুইটা ফোনকল পেলাম। দুইটাই এজেন্সি সংক্রান্ত। ফেসবুক খুঁজে বন্ধুর বন্ধু থেকে লতায় পাতায় খুঁজে আমার ফোন নম্বর পেয়েছে।

প্রথম জন এসেছে নয় মাস আগে, এর মধ্যে খরচ করেছে প্রায় দশ লাখের মতন। ভিসা বাড়ানোর জন্য ব্লক একাউন্ট করতে হবে না বলে চলে গিয়েছিল বার্লিনে। বার্লিনের ফরেন অফিসও ঘাস খায় না। গত দুই বছর অনেক ছেলে পেলে বার্লিনে গিয়ে ব্লক একাউন্ট ছাড়া ভিসা বাড়িয়ে নিয়েছিল, এখন গত ছয় মাস মতন সেই সুদিন আর নেই। বার্লিন থেকে সেই ছেলেকে ৩ মাসের নোটিশ দিয়েছে, আট লাখ টাকা ব্লক না করলে দেশে ফেরত। সবচেয়ে মর্মান্তিক হল টাকা পয়সা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় চার লাখ টাকা ল্যাংগুয়েজ স্কুলে দিয়েও ক্লাস করা হয়নি ছেলেটির। নয় মাসে শুধু খরচই হয়েছে দশ লাখ, ভাষা শেখা হয়নি দশ পাতাও।

দ্বিতীয় জন এসেছে মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে, এইচ এস সি পাস করেই। এই ছেলে আবার এক আধটু জানত এজেন্সির ব্যাপার স্যপার। তারপরও প্রথম কিস্তির দুই লাখ টাকা দেয়া হয়ে গেছে বলে যা হবার হবে বলে চলে এসেছে এজেন্সির মাধ্যমে। আসার পর পরই মাথা গরম। দেশে এজেন্সি বলেছে ব্লক একাউন্ট লাগবে না, এখানে তো আসার পর পরই আবিষ্কার করেছে ব্লক ছাড়া ভিসাই দিবে না। ভাষা শেখার জন্য আবার কন্ট্রাক্ট সাইন করে এসেছে, স্কুল থেকেই বাসস্থানের ব্যবস্থা। সেখানে হোস্টেলের থেকে ডাবল ভাড়া। বাসে ট্রামে ওঠার মুরোদ নেই, হেঁটে হেঁটে এর মধ্যে পায়ের জুতোর বারোটা। এখন কি করবে এই জন্য অসহায়ের মতন চারদিকে সাহায্যের আশায় ফোন করে বেড়াচ্ছে। আমাকে বলল, ভাইয়া অনেক টাকা দেনা করে চলে এসেছি, ফেরত যাওয়া যাবে না। দরকার হলে ইতালি গ্রীসে পালিয়ে যাব।

আমি আর বলি না যে, ইতালি গ্রীসের লোকজনেরা নিজ দেশের খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে জার্মান ভাষা শিখে জার্মানিতে “পালিয়ে” আসার আশায় বসে আছে। আসলেই এদের জন্য আর কিছু করার নেই। এরা না ভাষা শিখবে, না পড়াশোনা করবে। দুই দিন পর অবশ্য ঠিক বুঝতে পারবে, জার্মানিতে পালিয়ে থাকা যায় না। তখন এরাই হয়তো ইতালি বা গ্রীসের রাস্তায় গোলাপ ফুল বিক্রি করবে, আর রাতের বেলায় নোংরা মেসে শুয়ে গুমরে গুমরে কাঁদবে।

নিজের ও পরিবারের শেষ সম্বল নিয়ে যারা জুয়া খেলছে, এদের জন্য সত্যি আর কিছুই বলার নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন খারাপ করে ফোন ছেড়ে দিলাম।

শেষ কথাঃ

১০-১২ বছর আগে জার্মানিতে শুধুমাত্র ব্যাংকের কাগজ দেখালেই ভিসা দিত, বেশীরভাগ সময়ই ২ বছরের। সেখান থেকে এখন প্রায় সব শহরে ব্লক একাউন্টে ৮০০০ ইউরো রেখে মাত্র এক বছরের ভিসা দেয়া হচ্ছে। আমরা যতই ফাঁকিবাজি করি না কেন, এক সময় জার্মান সরকার সেটা ঠিকই ধরে ফেলছে। এজেন্সির মাধ্যমে যারা কোনমতে জার্মানিতে পা দিতে চায়, যাদের আসলে জার্মান ভাষা শেখার বা উচ্চশিক্ষার কোন উদ্দেশ্য নেই – এদের কারণে সামনের দিনগুলিতে ধীরে ধীরে মেধাবী ও যোগ্য ছেলে মেয়েদের ভিসা দেয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

সোনার হাঁস দিনে একটা করে সোনার ডিম দেয়, কিন্তু সেই হাঁসকে কেটে ফেললেও সব সোনার ডিম একসাথে পাওয়া যায় না। জার্মানিতে এখনো ভিসা পাওয়া ও বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষার যে সুযোগ, সেটা যেন কোন অবস্থাতেই আমাদের অপব্যবহারের কারণে বন্ধ না হয়ে যায়। যেকোনো উপায়েই হোক, শুধু নিজের ভিসা হলেই হল, অন্যদের কথা ভাবার দরকার নেই – এই জাতীয় প্রবাদে বিশ্বাসের দিন আর নেই। আর তারচেয়ে বড় কথাঃ যারা ফাঁকিবাজি দিয়ে এখানে আসছে, তারাও ভাল নেই একদমই!

প্রথম পদক্ষেপ: এসো সবাই মিলে এজেন্সিকে “না” বলতে শিখি!
“আমরা যদি না জাগি ভাই, কেমনে সকাল হবে!”

আদনান সাদেক, ২০১৩

#BSAAG_Agency_Hope_vs_Reality

Print Friendly, PDF & Email