জার্মানির পথে-৮: উচ্চশিক্ষার যোগ্যতা (পর্ব-১)

 

জার্মানির উচ্চশিক্ষার একটা ব্যাপার পৃথিবীর অন্যান্য পরিচিত গন্তব্যগুলো থেকে একদম ভিন্নরকম। তার মূল রহস্য লুকিয়ে আছে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় গুলির মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার মাঝে। এই দেশের প্রায় সকল ইউনিভার্সিটি স্টেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। গবেষণার পরিমাণ, ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা, কি কি বিষয় পড়ানো হবে ইত্যাদি অনেকগুলো ক্ষেত্র বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে সরকারি তহবিল থেকে অর্থের সংকলন হয়। তবে সরকার বা স্টেটকে এটাও মনে রাখতে হবে যে, একটা বিশ্ববিদ্যালয় চালানোর জন্য কিছু বিষয়াদির সব সময় যোগান থাকতে হবে। যেমন, গবেষণাগার, লাইব্রেরী, ক্যান্টিন, থাকার হোস্টেল বা খেলার মাঠ। একই সাথে প্রফেসরদের বেতন ভাতাও থাকে একটা নির্দিষ্ট নিয়মের ছক ধরে। এর উদ্দেশ্য যেন সকল ইউনিভার্সিটি থেকেই একটা মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে শিক্ষাদান চলে। এটাকে জার্মানিতে বলে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি বা সমবন্টন।

এই নিয়মের ফলে অনেক গুলো বড় ধরণের সুবিধা আছে। প্রথমত, যে কেউ জার্মানিতে পড়তে আসতে চাইলে তাকে শুধুমাত্র পছন্দের কোর্স বাছাই করে নিতে হবে। ইউনিভার্সিটির র‍্যাঙ্কিং নিয়ে মাথা ঘামানোর তেমন কোন প্রয়োজন নেই। ইউএসএ বা কানাডায় র‍্যাঙ্কিং ছাড়া কিছুই হয় না, তার কারণ ইউনিভার্সিটি গুলো মূলত টিউশন ফির উপর নির্ভরশীল, সুতরাং বেশী ছাত্র আকর্ষণ করার জন্য এদেরকে র‍্যাঙ্কিং এ উপরে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করতে হয়। এই কারণে মূলত এইসব দেশে কিছু ইউনিভার্সিটি প্রতিযোগিতায় অনেক উপরে চলে যায়, আর কিছু নেমে যায় একদম পাতালে। অনেকটা টাকার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় এদের মধ্যে, যা কিনা অনেক ক্ষেত্রেই এইসব প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরিয়ে আনে।

জার্মানিতে সকল ইউনিভার্সিটির ডিগ্রী প্রায় সমমূল্যের। এখানে মূলত প্রার্থীর নিজস্ব যোগ্যতা বিচার হয়, এবং সে কোন ইউনিভার্সিটি থেকে এসেছে এটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এমনকি বাইরের দেশেও এটা সবার জানা যে, জার্মানির ডিগ্রীর একটা মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ডের কথা। অন্যদিকে আমেরিকা, ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়াতে অনেক আগাছার মতন ইউনিভার্সিটি আছে, যেগুলো কিনা সার্টিফিকেট সর্বস্ব। এই কারণে অনেক সময় দেখা যায়, এই দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার জন্য সুযোগ পাওয়া অনেক সহজতর। হবে নাই বা কেন, এই টিউশন ফির টাকা না পেলে যে এদের অস্তিত্বই থাকবে না। অনেকটা আমাদের দেশের অলিগলিতে গজানো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির সাথে এদের তুলনা করা যায়, এরা মূলত বিজনেস সেন্টার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়।

এই সিরিজের অন্যান্য পর্ব

যেহেতু জার্মানিতে টিউশন ফি নেই, পড়াশোনা এখানে কোন পণ্য নয় এবং একই সাথে সকল বিশ্ববিদ্যালয় একটা নির্দিষ্ট মান বজায় রাখে – এই দেশে পড়তে আসতে হলে ছাত্রছাত্রীদেরও একটা বিশেষ যোগ্যতার কথা খেয়াল রাখতে হবে। আর সেটা হল, একটা নির্দিষ্ট মান নিয়ন্ত্রণ! কোনমতে শুধু একটা ডিগ্রী সার্টিফিকেট নিয়ে জার্মানিতে পড়তে আসাও যেমন উচিত হবে না, তেমনি সত্যিকার অর্থে যাদের উচ্চশিক্ষার যোগ্যতা নেই, তারা আসলে জার্মানিতে পড়ার জন্য যোগ্য নয়।

স্টুটগার্টের একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ইনফোটেক বলে এখানে যে মাস্টার্স কোর্স চালু আছে, তাতে ২০০০ সালের দিকে শুধু বুয়েটের ছেলেরা আসত। একসময় দেখা গেল দেশের অন্যান্য প্রাইভেট ইউনির ছেলেমেয়েদের অনেক বেশী সিজিপিএ এবং এদের কারণে বুয়েটের (এমনকি চুয়েট বা রুয়েটও খুব কম) ছেলেপেলেরা বাছাই পর্বে বাদ পড়তে থাকল। ২০১৩ তে এখন স্টুটগার্টে প্রায় ৯০ ভাগ ছেলেমেয়েরাই অখ্যাত প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে পড়তে এসেছে। এদের মধ্যে অনেকেই শুধুমাত্র নামেমাত্র ভাল রেজাল্ট ধারী হয়ে এডমিশন পেয়েছিল। ফলাফল: দুই বছরের কোর্স শেষ করতে প্রায় বেশীরভাগেরই সাড়ে তিন থেকে চার বছর লেগে যাচ্ছে।

তাই যারা গন্তব্য হিসেবে জার্মানিকে ঠিক করেছে, তাদের জন্য প্রথম যোগ্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব থাকবে নিজের উপরই। টেকনিক্যাল সলিড জ্ঞান, ভাষা-গত যোগ্যতা (জার্মান বা ইংরেজি), নতুন দেশের নতুন পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে চলার মতন ধৈর্য এবং পরিশ্রমী মনোবল, নিজের কাজ নিজে গুছিয়ে নেবার মানসিকতা, সময় জ্ঞান, পরিকল্পিত এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা – এই যোগ্যতা এবং গুণগুলো যাদের আছে, তারাই জার্মানিতে আসার জন্য নিজেকে যোগ্য বলে মনে করতে পারে।

যোগ্যতা আসলে দুই রকম, একটা সার্টিফিকেট যোগ্যতা, আর আরেকটা সত্যিকার অর্থে  কিছু জানা। প্রথমটি খুব সহজেই যোগাড় করে নেওয়া যায়, দ্বিতীয়টির যায় না। এদেশে যেহেতু পড়ানোর জন্য কারও কাছে থেকে পয়সা নেওয়া হচ্ছে না, এবং বিশ্ববিদ্যালয় গুলি চেষ্টা করবে তাদের মান বজায় রাখতে, এখানে ধরেই নেওয়া হবে যে আগত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দ্বিতীয় যোগ্যতাটা ভাল মতনই আছে।

লেখকঃ আদনান সাদেক

জার্মানির পথে-৮: উচ্চশিক্ষার যোগ্যতা (পর্ব-২)

#BSAAG_University_Admission_and_Requirements

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা বা ক্যারিয়ার সংক্রান্ত প্রশ্নের জন্য যোগদিন বিসাগের ফেসবুক ফোরামে:   www.facebook.com/groups/bsaag.reloaded
জার্মান ভাষা অনুশীলন এবং প্রশ্নোত্তের জন্য যোগ দিন ফেসবুকে বিসাগের জার্মান ভাষা শিক্ষা গ্রুপেঃwww.facebook.com/groups/deutsch.bsaag

Print Friendly, PDF & Email

ফেসবুক মন্তব্যঃ

Leave a Reply

  1. মাদ্রাসা থেকে পাশ করে কি জার্মানিতে ভর্তি হওয়া যাবে।

     
  2. I have completed Diploma in Engineering in computer science 2012. Now i am continue one job in it vendor company in Bangladesh, Designation of Assistant Systems Engineer (Hardware). I want to go German for study B.Sc in computer science, and Service. How i can complete my mission please inform me. My Facebook id enmamun143@yahoo.com, Skype id engmizanurrahman,

     
  3. Pingback: বিসাগ ওয়েব সাইটের জনপ্রিয় আর্টিকেল (আপডেটঃ ২রা মার্চ, ২০১৪) | বিসাগ (www.BSAAGweb.de)