আখেন: ইউরোপের বুকে রাজকীয় শিক্ষা

 

আখেন, আন্তর্জাতিক ছাত্র-ভিত্তিক এবং নতুন ধারণার জন্য সবসময় খোলা। এটি জার্মানির পশ্চিমস্থ একটি শহর,  বেলজিয়াম এবং ডাচ সীমান্তে অবস্থিত। মর্যাদাপূর্ণ কারিগরি কলেজ , ইউরোপের কেন্দ্রে অবস্থান এবং উপযোগী আকার আয়তনের  কারনে আখেন আন্তর্জাতিক ছাত্র/ছাত্রীদের  চুম্বকের মতো  আকর্ষণ করে। আখেন রোমানদের খুব পছন্দের ছিল। তারা জানতো কিভাবে এর গরম ঝরনা এবং পাবলিক স্নানাগারের সুবিধা ভোগ করতে হয়। বলা হয় এই পানির নিরাময় করার  বৈশিষ্ট্য আছে। এখনও Elisenbrunnen থেকে গরম পানি প্রবাহিত হয়, যা শহরের কেন্দ্রে এবং অত্যাশ্চর্য ক্যাথেড্রালের  সামনে অবস্থিত।

আখেন শহরের তথ্য এবং পরিসংখ্যানঃ

অধিবাসী : ২৩৯,০০০ জন

ছাত্র/ছাত্রী: ৫২,৫০০ জন

বিশ্ববিদ্যালয়: ২

মাসিক ভাড়া: ৩০০-৩২০ ইউরো।

সম্রাট Charlemagne ৮ম শতাব্দীতে আখেন কে তার সাম্রাজ্যের কেন্দ্র হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। ইনিই সেই বাক্তি যে এই  শহরের বিশাল ক্যাথেড্রাল এবং সুন্দর সিটি হল নির্মাণ করেছিলেন।  সার্লেমাগনের দেহাবশেষ এর পাশেই ক্যাথেড্রাল অবস্থিত। আখেনের ক্যাথেড্রাল কে প্রথম জার্মান ল্যান্ডমার্ক হিসেবে ১৯৭৮ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান  হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

সিটি হল Charlemagne এর আগের প্রাসাদের অংশ হিসেবে ধরা হয়। এখন যেখানে প্রতি বছর  আখেন  আন্তর্জাতিক চার্লেমাগনে পুরস্কার বিতরন করা হয়। ইউরোপীয় ঐক্য প্রচারে যারা নিজেদের সমর্পণ করেছেন তাদের এ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল সাবেক পুরস্কার বিজয়ীদের একজন।

ছবিঃ আখেন (ক্যাথেড্রাল) গির্জা

ছবিঃ আখেন (ক্যাথেড্রাল) গির্জা

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আগ্রহী  ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের একটি হল আখেন। ১৮৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত RWTH Aachen বিশ্ববিদ্যালয়, যার চমৎকার আন্তর্জাতিক খ্যাতি আছে। বর্তমানে  RWTH  আখেন ক্যাম্পাস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্টনারদের সহযোগীতায়  ইউরোপের অন্যতম বৃহত্তম বিজ্ঞান পার্ক  নির্মাণ করছে।

আখেন, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ড সীমান্তে  অবস্থিত, যাকে “ত্রিমুখী সীমান্ত” ও বলা হয়।এর অর্থ আপনি সহজেই এক দিনের মধ্যে তিনটি  দেশে ভ্রমন করতে পারবেন!

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল আখেন ক্যাথেড্রাল এবং সিটি হল ঘিরে বার্ষিক বড়দিনের বাজার। এখানে আপনি ছুটির দিন উপভোগ করতে পারেন এবং বিখ্যাত Aachener Printen ও সুস্বাদু জিনজার ব্রেড বিস্কুট খেতে পারেন। বিখ্যাত ক্রাইম সিরিজ “Tatort” দেখবেন  “zuhause” এ, এটি একাধারে একটি কফি হউজ এবং বার!

সারিবদ্ধ বাড়ি ঘরের ছবি

সারিবদ্ধ বাড়ি ঘরের ছবি

আখেনে  বসবাসঃ

আখেনের দৈনন্দিন জীবন প্রচুর ছাত্রের কারনে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহের জন্য এখানে বিভিন্ন ধরনের ক্রীড়া কোর্স চালু রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্রীড়া সেন্টার প্রতিটি সেমিস্টারে অনেক খেলাধুলা  বিষয়ক ইভেন্টের আয়জন করে, যেমন- জনপ্রিয় “Lousberg marathon”।  দৌড়বিদদের লাউসবার্গে (Lousberg) ৫,৫০০ মিটার জিগজ্যাগিং(zigzagging)করতে হয়, এটি আখেন এর বৃহত্তম পাহাড়।

এছাড়া “Tivoli স্টেডিয়ামেও  ক্রীড়া ইভেন্ট  অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে  স্থানীয় ফুটবল দল  “Alemannia Aachen ” খেলে। সবসময় এখানে একটি  স্থানীয় খেলা  থাকে, যেখানে কয়েক হাজার মানুষ তাদের দলের খেলা দেখার জন্য জড় হয়।স্টেডিয়ামের মনোরম পরিবেশের সাথে কোন কিছুরই তুলনা হয় না!

যখন আবহাওয়া  চমৎকার থাকে, তখন  ছাত্ররা, বিশেষ করে  Westpark  যেতে পছন্দ করে। শহর মাঝখানে, পুকুর, বড় তৃণভূমি এবং বার্বিকিও করার  জন্য গ্রিল, রৌদ্রজ্জ্বল একটি বিকেলের জন্য একদম পারফেক্ট। এছাড়াও আপনি রিল্যাক্স করতে পারেন অথবা লাউসবার্গের দিকে হাটতে পারেন, এখান থেকে পুরো শহরটিকে চমৎকার ভাবে দেখা যায়।

Pontstrasse এ অধিকাংশ ছাত্ররা আড্ডা দেয়। এখানে অনেকগুলো রেস্টুরেন্ট, পাব এবং নাইটক্লাব আছে যেগুলো সাশ্রয়ী এবং ছাত্রদের মধ্যে খুব জনপ্রিয়। উদাহরণস্বরূপ Café Egmont , গ্রীষ্মকালে শনিবার করে লাইভ সঙ্গীত শোনার জন্য দারুন একটি জায়গা। বেশকিছুটা দূরে “Ponte” নামে একটা জায়গা আছে স্থানীয় ছাত্ররা যাকে Pontstrasse বলে ডাকে, সেখানে আপনি Domkeller বা Guinness House একটি সত্যিকারের আইরিশ পাব, এর মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন ।

মারলিন বাজ বলেনঃ

রবিবার রাতের ক্রাইম সিরিজ “Tatort” (ক্রাইম সিন) জার্মান সংস্কৃতির একটি আসল হিরা। আমি এ বিখ্যাত ক্রাইম সিরিজের একটি পর্ব zuhause এ আপনাকে দেখতে বলবো, যেখানে আপনি একটা একঘেয়েমি- ঝিম ধরা ছুটিরদিন রবিবার কে স্থানীয়দের রবিবারের মতো করে উপভোগ করতে পারবেন!

ফিলিস্তিনের আনাস এর সঙ্গে মারলিন এর সাক্ষাৎকারঃ

আনাস আবদেল রাজেক ২৭  বছর বয়সী এবং আখেন এ তার ডক্টরেট নিয়ে কাজ করছে। তিনি ইতিমধ্যেই সফটওয়্যার সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং এ আন্তর্জাতিক মাস্টার্স  প্রোগ্রাম সমাপ্তির পরে  RWTH আখেন এ তার মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেছেন। DAAD বৃত্তির মাধ্যমে তার পড়ালেখার খরচ বহন করা হয়।

ফিলিস্তিন এর আনাস আবদেল রাজেক

ফিলিস্তিন এর আনাস আবদেল রাজেক

তাকে মারলিন প্রশ্ন করেছিলেন কেন আপনি আখেনে অধ্যয়ন করার সিদ্ধান্ত নেন?

আনাস বলেন- আমি বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আখেন কে বেছে নিয়েছি। প্রথমে আমি আমার ডিগ্রী প্রোগ্রামের জন্য জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর র‍্যাঙ্কিং দেখি এবং দেখলাম যে  আখেনের র‍্যাঙ্কিং TU মিউনিখের সমান। আর আখেনে আমার বেশকিছু বন্ধু ও ছিল এবং তারা আমাকে এখানে আসতে  উৎসাহ দেয়।

জার্মানিতে জীবন কি ধরনের হতে পারে এ নিয়ে আপনার কোনো প্রত্যাশা আছে কি? এবং সেগুলো কি নিশ্চিত?

আমি ভেবেছিলাম যে জার্মানরা খুব খুঁতখুঁতে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ নয়।তাদের খুঁতখুঁতে হবার বিষয়টা সত্য। উদাহরণস্বরূপ সময়নিষ্ঠতার কথা বলা যেতে পারে , আমাদের সংস্কৃতিতে এটা অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিষয়টা হল তারা অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ। আমি প্রথমে একটি জার্মান পরিবারের সঙ্গে  থাকতাম এবং তারা আমাকে সবকিছু দেখিয়েছেন। আমি এর মধ্যে বাসা পরিবর্তন করেছি, কিন্তু আমাদের মধ্যে এখনও খুব ভাল সম্পর্ক রয়েছে।

শুরুরদিকে জার্মানিতে আপনার জন্য সবচেয়ে কঠিন জিনিস কি ছিল?

এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ানোর পদ্ধতি ফিলিস্তিন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এখানে ছাত্রদের নিজেদের দায়িত্ব নিজে  নিতে শিখতে হবে। ফিলিস্তিনে, প্রতিদিন আপনাকে কি করতে হবে তা কেউ বলে দিত। ফিলিস্তিনে কেবল সেমিস্টারে শেষে একটি পরীক্ষা হতো।কিন্তু জার্মানিতে  পুরো সেমিস্টারে  জুড়ে বিভিন্ন পরীক্ষা আছে। প্রথম পরীক্ষা আমার জন্য একটু কঠিন ছিল কারন আমি জানতাম না কিভাবে নিজেকে এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবো।

মাস্টার্স করার পাশাপাশি আপনি কি কোন পার্ট-টাইম জব করতেন? যদি করে থাকেন, তাহলে আপনি কিভাবে জব খুঁজে পেয়েছিলেন?

হ্যাঁ, দ্বিতীয় মাস থেকে  শুরু করেছিলাম। আপনি কাজের বিজ্ঞাপন চেক করতে পারেন, যেমনঃ “Schwarzes Brett” (বিশ্ববিদ্যালয় এর ম্যাসেজ বোর্ডে)। সে সময়ে আমার টাকা রোজগার নিয়ে চিন্তা ছিল না। আমি শুধু আমার পড়ালেখার সময়ে আরো অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চেয়েছিলাম। এটা গবেষণা দলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য ভাল একটি সুযোগ, কারণ পরবর্তীতে আপনি সে প্রকল্পগুলোতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

আখেনের কোন বিষয়টা আপনার সবচেয়ে ভালো লাগে?

আমার সত্যিই আখেনের আকার পছন্দ। এটা খুব ছোট ও না আবার খুব বড় ও না, এবং আপনি যদি আপনার বন্ধুদের সাথে বাইরে যেতে চান, তাহলে আপনি পাঁচ মিনিটের মধ্যে দেখা করতে পারেন।আখেন ছাত্রদের শহর। শহর হিসাবে এতে আপনার যা কিছু প্রয়োজন তার সবই পাবেন।

ছবিঃ আখেন ওয়েস্ট পার্ক

ছবিঃ আখেন ওয়েস্ট পার্ক

আমি একটি ছাত্র সংগঠনের সাথেও জড়িত আছি। আমি প্রথম যখন আখেনে আসি, তখন তারা আমাকে সাহায্য করেছে।আমি এখন আমার অবসর সময়ে আখেনে আসা নতুন ছাত্রদের সাহায্য করতে পারি। আমরা অনেক ইভেন্টের আয়োজন করি যেখানে জার্মানরাও অংশগ্রহণ করে।

জার্মানদের সাথে কিভাবে মিশতে হবে এ বিষয়ে আপনার কোন পরামর্শ আছে? তাদের সংস্পর্শে আসার সবচেয়ে ভাল উপায় কি?

জার্মানদের সাথে মিশতে একটু সময় প্রয়োজন, যখন তারা মিশবে,তখন দেখবেন তারা সত্যিই খুব ভাল বন্ধু।জার্মানদের কাছে বন্ধুত্বের প্রচুর সংজ্ঞা আছে – “তিনি আমার সহকর্মী, তিনি আমার বন্ধু, আমার প্রতিবেশী …” এক স্টেপ থেকে অন্য স্টেপে যেতে সময় লাগে। আপনি এটার সাথে যখন অভ্যস্থ হয়ে যাবেন, তখন আপনি সত্যিই বন্ধু বানাতে পারবেন।

 

সুত্রঃ study-in.de

অনুবাদকঃ সাজেদুর রহমান, রাজশাহী।

Print Friendly