শুভ নববর্ষ

 

শুভ নববর্ষ

সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে আমি আমার লেখা শুরু করছি।

শৈশবের বৈশাখ:

ছোটবেলা থেকেই পহেলা বৈশাখ আমার খুব প্রিয়। আমি যখন ক্লাস ওয়ান-এ পড়ি, তখন আমরা পিরোজপুরে থাকতাম। পহেলা বৈশাখ এর দিন হাল-খাতা শুরু হতো বিভিন্ন দোকানে। আমাকে আমার প্রিয় সালাম কাকুর (যার কাছে আমি মানুষ) সাথে স্কুল থেকে ফেরার পথে বিভিন্ন দোকানদার আদর করে ডেকে মিষ্টি খেতে দিত। আমার বাবা ঐ এলাকায় খুবই সুপরিচিত ছিল দেখে সবাই আমাকে চিনত। আর আমারও খুব মজা লাগত গাঢ় কমলা রঙের ভয়াবহ মিষ্টি খেতে।

বিকাল বেলা আমি, সালাম কাকু, আমার বোন অমি, আমাদের কাজে সাহায্য করতো যে মেয়েটি সে, আমার বন্ধুরা – কৃষ্ণ, গোপাল, টুটু, মনু সবাই মিলে বৈশাখী মেলায় যেতাম। মেলা থেকে আমরা মাটির হাড়ি-পাতিল, ঘোড়া, পুতুল – এসবই কিনতাম। সেই হাড়ি-পাতিল দিয়েই সব বন্ধুরা মিলে আমরা রান্না-বানা খেলতাম। এখন নিজের সংসারে কত রান্না করি। কিন্তু ছোটবেলার সেই রান্নার আনন্দ পাই কি?

পহেলা বৈশাখে আমাদের বাসায় অনেক কিছুর আয়োজন থাকতো। অনেকেই আসতেন বাসায়। আমার বাবা বড় কোন মাছ কিনতেন। বছরের প্রথম দিনটিতে তাই নানারকম মিষ্টি, দই, পায়েস, আরও অনেক খাবার থাকতো। তখন আমার এসব খাবার একেবারেই পছন্দ ছিল না। তখন কি আর জানতাম, আমার পরবর্তী জীবনে জার্মানিতে থাকতে হবে! আর এসমস্ত খাবারের জন্য করতে হবে হাহাকার।

ঢাকায় বৈশাখী মেলা:

ক্লাস টু-এর শেষের দিকে আমরা ঢাকায় চলে আসি। আমরা তখন কাজিনরা সবাই মিলে বৈশাখী মেলায় যেতাম। যখন ক্লাস সিক্স-এ পড়ি, আমি আর আমার কাজিন নোভা একসাথে রিক্সায় মেলায় যাওয়ার অনুমতি পেলাম। আমরা দু’জনে একটা রিক্সায়, আর মামা-মামি, মা-খালা, অন্যান্য কাজিনরা অন্য সব রিক্সায়। স্বাধীনতার কি আনন্দ আমার আর নোভার তখন! আমরা মেলা থেকে চুড়ি কিনতাম খুব। আর কাঁচা আমের ভর্তা! দিনগুলির কথা মনে পড়লে আজও যেন কাঁচের চুড়ির সেই রিনঝিন শব্দ পাই।

নীষার জন্ম:

পহেলা বৈশাখ আমার ছোট বোনেরও জন্মদিন। কারণ অবশ্য আমার মা। মা’র ইচ্ছা ছিল বাচ্চা যেহেতু সিজার-ই হবে তো তারিখটা বিশেষ কোনও দিন হোক। তাই চৈত্র সংক্রান্তির দিন না হয়ে পহেলা বৈশাখ। আমার ছোট বোনটি এজন্য মা’র কাছে এখনও কৃতজ্ঞ।

সেদিনটির কথা আমার এখনও খুব মনে পড়ে। আমার মা সকালে হাসপাতালে গেলেন। সঙ্গে গেলেন আমার বাবা, নানু আর ছোট মামা। আর আমরা ছয় কাজিন বড় মামা-মামির জিম্মায়। বড় মামা প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ তখন শহীদুল্লাহ হলের হাউজ টিউটর। হঠাৎ শুরু হল কালবৈশাখী ঝড়! ইউনিভার্সিটিতে অনেক আম গাছ ছিল। বড়মামা আমাদের সবাইকে নিয়ে আম কুড়াতে বের হয়ে গেলেন। খুব বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল তখন, আর আমরা ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু তারপরও আম কুড়িয়ে যাচ্ছিলাম। বড়মামা তাই বললেন, “ভয় পেওনা। বাচ্চাদের গায়ে কখনও বিদ্যুৎ পরে না।” সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সব ভয় কেটে গেল। (কথাটা যদিও মিথ্যা ছিল, পরে জেনেছি)।

আমরা সবাই চিৎকার করে নতুন উদ্যমে আম কুড়াতে শুরু করলাম। আর কি কোনদিন বড়মামার সাথে আম কুড়ানো হবে আমাদের? কুড়ালেও কি আমি পাবো ছোটবেলার সেই আনন্দ?

সত্য বলার বিড়ম্বনা:

আমি তখন লালমাটিয়া কলেজে পড়ি। আমরা তিন ফ্রেন্ড ছিলাম – আমি, ইমা আর পুণ্য, যারা কলেজে সবসময় একই সাথে থাকতাম। ইমা আর পুণ্য পহেলা বৈশাখ সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতো যা ছিল আমার অজানা। ওদের দু’জনেরই বড় ভাই ছিল। তাদের সাথে ওরা টি,এস,সি, রমনার বটমূল, চারুকলা – এমন অনেক জায়গায় ঘুরেছে।

“এবার শুধু আমরা তিনজন ঘুরবো”, ওরা বলল, “বড় ভাই-টাই নিবো না। ভাইদের সাথে গেলে খালি খবরদারি করে!” কিন্তু বাসা থেকে ছাড়বে না একা। তাই ওরা মিথ্যা কথা বলবে। বলবে, “শর্মির বড় ভাই ‘নুহাশ’-এর সাথে আমরা যাব”। (নুহাশ আমার কাজিন। বয়স তখন ওর ২ বছর।) আর আমি বাসায় বলব ইমার ভাই এর সাথে যাচ্ছি। সবাই আমরা লাল শাড়ি, বেলি ফুল পড়বো, সব ঠিকঠাক। সবাই আমরা নিষিদ্ধ কাজের উত্তেজনায় উত্তেজিত।

কিন্তু আমি আর পারলাম না। আগের রাতে মাকে আমাদের ‘প্ল্যান’ খুলে বললাম। সব শুনে মা প্রচন্ড বকা দিলেন। বললেন, “যেতে হবেনা তোর মেলায়”।

আমি অনেক কাঁদলাম। তবু কোনও লাভ হল না। তখনই বুঝলাম, ‘সদা সত্য কথা বলিবে’- কত বড় একটা মিথ্যা।

বিশ্ব-সাহিত্য কেন্দ্রের পহেলা বৈশাখ:

আমি তখন বিশ্ব-সাহিত্য কেন্দ্রের সদস্য। আমার স্বাধীনতাও তখন একটু বেশি। সালটা ১৯৯৫।

কিছুদিন পরই আমাদের এইচ,এস,সি পরীক্ষা। একদিন টি,এস,সি-তে গেলাম বন্ধুদের সাথে। যথারীতি আমরা শাড়ি, ফুল, টিপ, চুড়ি পরা। তখন হঠাৎ আমার বিশ্ব-সাহিত্য কেন্দ্রের এক ফ্রেন্ড-এর সাথে দেখা। আমার সেই ফ্রেন্ড আবার একটু অন্যরকম চিন্তা-ধারার ছিল। ওর কথায় অসম্ভব আত্মবিশ্বাস থাকত। আমার সেই ফ্রেন্ড আমাকে দেখেই বলল, “শর্মি, তুমি এগুলি কি পড়েছ? শাড়ি পড়েছ, ঠিক আছে। কিন্তু টিপ, চুড়ি, কানে দুল, পায়ে নূপুর! জানো এগুলি কোথা থেকে এসেছে! আগে মেয়েদের পায়ে বেড়ি পড়িয়ে রাখতো পুরুষ-শাসিত সমাজে। সেখান থেকেই এই নূপুর আর চুড়ি।” বিরাট একটা লেকচার দিয়ে আমার মনটাই খারাপ করে দিল। কারণ আমার অন্য ফ্রেন্ডরা বলছিল, “শর্মি, তোকে আজকে খুব সুন্দর লাগছে”।

আমি তখনও বুঝতে পারছিলাম না, ও কেন শুধু আমাকেই এসব বলছে। অন্য ফ্রেন্ডগুলিকে কেন কিছু বলছে না। আর ওর গলার স্বর সুনে মনে হচ্ছিল আমি ওর কথা শুনতে বাধ্য। আমার অন্য ফ্রেন্ডরা বলল, “খুব সাবধান! ‘আদনান’ থেকে সাবধান!!”

কিন্তু এই সাবধানতায় কোন লাভ হল না। এই ছেলেটাই পরবর্তীতে আমার জীবনসঙ্গী হল। এহা, রিহা ফিহার বাবা হল। আমরা দু’জন দু’জনকে চিনি প্রায় ২০ বছর। একসাথে থাকলাম ১২ বছর। কতটা সময় কেটে গিয়েছে!! তবে বর্তমানে আদনান ক্রিকেট খেলে এবং বিসাগ নিয়ে আমার জীবন ভাজা-ভাজা করে দিচ্ছে। তারপরও মনে হয় জীবন যদি আবার শুরু হয়, আমার বন্ধুদের সাবধান-বাণী আবারও শুনবো না।

আমার দেখা শেষ বৈশাখী মেলা:

সালটা ২০০১।

আমি, আমার মা-বাবা আর দুইবোন রমনার বটমূলে গেলাম। আমার ছোটবোন নীষা ছায়ানট-এর শিল্পী। ও গান গাবে। আমরা রমনার গানের অনুষ্ঠান শেষ না করেই ফিরছিলাম। হঠাৎ কেমন একটা পটকা ফুটানোর শব্দ শুনলাম। তারপরে দেখলাম ভ্যান-এ করে সারি সারি লাশ নিয়ে যাচ্ছে। রক্তে সব মাখামাখি। আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে মর্মান্তিক আর বীভৎস দৃশ্য ছিল এটা। সেটা নিয়ে আর লিখতে চাই না। লিখে ঠিক মত প্রকাশও মনে হয় করা যাবে না। সেবারই রমনার বটমূল বোমা হামলার শিকার হয়। এরপর আর আমি রমনার বটমূলে যাইনি কখনও।

কবে বন্ধ হবে এই হানাহানি? কেন একজনের আনন্দ আরেকজনের কাছে এতই পীড়াদায়ক যে বন্ধ করতে হবে বোমা মেরে? কবে বন্ধ হবে এইসব বিকৃত মানুষের বিকৃত রুচির প্রকাশ? কবে? আজও আমার বোন রমনায় গান গায়, আর আমি ঘরে বসে প্রার্থনা করি সবকিছু যেন ভালয় ভালয় শেষ হয়।

সবাইকে আবারও নববর্ষের শুভেচ্ছা।

শবনম হায়দার শর্মি, লিওনবার্গ, জার্মানি থেকে।

 

Print Friendly
Adnan Sadeque
Follow me

Adnan Sadeque

লেখকের কথাঃ
http://bsaagweb.de/germany-diary-adnan-sadeque

লেখক পরিচয়ঃ
http://bsaagweb.de/adnan-sadeque
Adnan Sadeque
Follow me